রাজশাহীতে রেলের ভূসম্পত্তি উদ্ধারে কর্তৃপক্ষের ভুমিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন

রাজশাহীতে রেলের ভূসম্পত্তি উদ্ধারে কর্তৃপক্ষের ভুমিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন

রাজশাহীতে বাংলাদেশ পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের কয়েক কোটি টাকা মুল্যের অন্তত ১২ কাঠা জমি হাতছাড়া হওয়ার আশংকায় স্থানীয়দের অভিযোগের উপর ভিত্তি করে এবং বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর সমন জারি করেছিলেন চীফ এষ্টেট অফিসার (পশ্চিম) মো: রেজাউল করিম।

আজ মঙ্গলবার (১১ জুন) সকাল ১০টার সময় অভিযোগকারী এবং-দখলদার বিবাদী গংদের নিজ নিজ রেকর্ডপত্র নিয়ে হাজির হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এদিন রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে শুনানি হওয়ার কথা ছিল। এসময় স্থানীয় অভিযোগকারীরা অত্র দফতরে হাজির হলেও হাজির হননি বিবাদী গং। এছাড়াও অফিসচলাকালীন সময় উপস্থিত ছিলেননা বাংলাদেশ রেলওয়ের চীফ এষ্টেট অফিসার (পশ্চিম) মো: রেজাউল করিম।

তিনি জানান, দাফতরিক কাজে খুলনায় অবস্থান করছি। পরবর্তীতে তারিখ নির্ধারণ করে অভিযোগকারী এবং বিবাদীদের জানিয়ে দেওয়া হবে।

অভিযোগ উঠেছে, নগরীর ১৯ নং ওয়ার্ডের আওতাধীন হাজরাপুকুর এলাকায় রেলওয়ের অন্তত ১২ কাঠা জমি স্থানীয় আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম ও রেলওয়ের সাবেক কর্মচারী খাদেমুল ইসলামের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দিয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করছে রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী অধিদপ্তর। আর রেলওয়ের ছেড়ে দেওয়া জায়গা সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘিরে নিচ্ছে দখলদাররা। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি উদ্ধার ও দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা সম্প্রতি পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক বরাবর গণস্বাক্ষর সম্বলিত একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। একইসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব, রেলওয়ের মহাপরিচালক, প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা ও প্রধান প্রকৌশলী বরাবর এর অনুলিপি দেওয়া হয়েছে।

লিখিত অভিযোগে স্বাক্ষর করেছেন নগরীর চন্দ্রিমা থানার শিরোইল কলোনী এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার, স্থানীয় বাসিন্দা জেসমিন, আকলিমা, আবুল হোসেন, নূরুল ইসলামসহ প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ। লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, শিরোইল কলোনী এলাকায় রেলওয়ের হাজরাপুকুর ভরাট করে সেখানে রেলওয়ের জমি দখলে নিয়ে কারখানা তৈরি করেছেন কামরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। এছাড়া তার বেয়াই খাদেমুল ইসলাম দোতলা বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। দখল করা জমির পরিমাণ অন্তত ১২ কাঠা। বর্তমানে এই জমির বাজার মুল্য আনুমানিক ৩ কোটি টাকা বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, হাজরাপুকুর এলাকার এই জমি দখলমুক্ত করা বা বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বারবার সুরাহা করার আশ্বাস দেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে বাস্তবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হয়নি। রেলওয়ের সম্পত্তি উদ্ধারে স্থানীয়দের তৎপরতা থাকলেও এব্যাপারে নিরব ভুমিকায় রয়েছেন রেল কর্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ১৯ নং ওয়ার্ড আ’লীগের অন্যতম এক র্শীর্ষ নেতা মাস চারেক আগে সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে আ’লীগ নেতা কামরুল ইসলাম ও রেলওয়ের সাবেক কর্মচারী খাদেমুল ইসলামের বিরুদ্ধে জমি দখলের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। এ নিয়ে তখন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল। আ’লীগের ওই নেতা জানিয়েছিলেন, বছর দশেক আগে হাজারাপুকুর এলাকায় থাকা একটি পুকুর ভরাট করেন আ’লীগ নেতা কামরুল ইসলাম ও রেলওয়ের সাবেক কর্মচারী খাদেমুল ইসলাম। এরপর সেখানে একপাশে ব্যবসায়িক কারখানা নির্মাণ করেন কামরুল ইসলাম। এই কারখানায় লোহার দরজা, জানালাসহ গৃহ নির্মাণের বিভিন্ন ধরণের সামগ্রী তৈরি করে বিক্রি করা হয়। কামরুল ইসলাম এই কারখানায় ব্যবসা করে প্রতি মাসে বিপুল টাকা আয় করেন। আর কামরুল ইসলামের কারখানার আরেক পাশে রেলওয়ের জমিতে দুই তলা বিশিষ্ট পাকা বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন খাদেমুল ইসলাম।

জানতে চাইলে স্থানীয় বাসিন্দা ও লিখিত অভিযোগে স্বাক্ষরকারী জেসমিন আকতার জেমি অভিযোগ করে বলেন, রেলওয়ের অন্তত ১৪/১৫ কাঠা জমি কামরুল ইসলাম ও খাদেমুল ইসলামের দখলে ছেড়ে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করছে রেল কর্তৃপক্ষ। এছাড়া রেলওয়ে সীমানার মধ্যে অনেক গরিব মানুষ এবং ভূমিহীনদের বসবাস। উচ্ছেদ হলে সকলের হবে। কামরুল ইসলাম ওয়ার্ড সেক্রেটারি বলে তাদের কাছে অলিখিত জমি হস্তান্তর করে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করবে এটা আমরা হতে দিবনা।

অভিযোগে আরও একজন স্বাক্ষরকারী আব্দুস সাত্তার রানা বলেন, আজ মঙ্গলবার শুনানির দিন ধার্য করে আমাদের সমন জারি করেছিলেন চীফ এষ্টেট অফিসার মো: রেজাউল করিম। অভিযোগে গণস্বাক্ষরকারী ৬০/৭০ জন নারী-পুরুষদের নিয়ে চীফ এষ্টেট অফিসে হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু তিনি দাফতরিক কাজে রাজশাহীর বাইরে আছেন বলে জানিয়েছেন। পরে উপস্থিত সকলের হাজিরা সিটে স্বাক্ষর নিয়ে পরবর্তী ডেট জানিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান রেজাউল করিম।

রানা বলেন, রেলের জমি উদ্ধারে কর্তৃপক্ষের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এব্যাপারে তাদের কোন মাথা ব্যাথা নাই। সরকারি জমি উদ্ধারে তারা যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে প্রয়োজনে আমরা আদালতের দ্বারস্থ হব। এছাড়া দুরর্নীতি দমনে অভিযোগ দায়ের করবো রেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বলেও জানান তিনি।

স্বাক্ষরকারী আকলিমা বেগম বলেন, অভিযোগ দেওয়ার পরে কামরুল ইসলামের দখলে রেলওয়ের যতটুকু জমি আছে তার মধ্যে সামান্য কিছু অংশ ছেড়ে দিলেও পুরোপুরি ছাড়েননি। দখল করা জমির বেশির ভাগ অংশই এখনো তাদের দখলে রেখেছেন। এছাড়া তাদের বাসার বিল্ডিংয়ের কিছু অংশও রেলওয়ের জমিতে পড়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সচেতনভাবে জানলেও এই জমি উদ্ধার না করে কামরুলের দখলে ছেড়ে দিয়ে রেলওয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। শুধু আকলিমা নয়, এমন অভিযোগ স্থানীয় আরো অনেকের।

জমি দখলের ব্যাপারে নগরীর ১৯ নং ওয়ার্ড আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ের জমি উদ্ধারে আমারা কোন বাধা দিচ্ছিনা। তাদের প্রয়োজন হলে নিজেরাই উদ্ধার করে নিবে। তবে রেলওয়ের সাবেক কর্মচারী খাদেমুল ইসলামের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে পশ্চিামাঞ্চল রেলওয়ের কানুনগো মনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তারা রেলওয়ের জমি দখল করে থাকলে কর্তৃপক্ষ জমি দখলমুক্ত করবে। তবে রেলওয়ের কিছু জমি কামরুল ও খাদেমুলের দখলে থাকার কথা স্বীকার করলেও ঠিক কতটুকু পরিমাণ জমি তারা দখলে রেখেছেন সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেননি তিনি।

এব্যাপারে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে দরপত্র আহবানকারী প্রতিষ্ঠান পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী আসাদুল হকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *