সোনালী সময় : বাংলাদেশে কর্মসংস্কৃতির একটি অলিখিত নিয়ম হলো—যে কর্মী যত দেরিতে অফিস থেকে বের হন, তিনি তত বেশি ‘নিষ্ঠাবান’ ও ‘পরিশ্রমী’। বিশেষ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও সেক্টরে এই মানসিকতা যেন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। কিন্তু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, দীর্ঘ সময় অফিস করা মানেই সবসময় অধিক কাজ বা দায়িত্ববোধ নয়; বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কিছু কাঠামোগত ও মানসিক সমস্যা।
আমাদের দেশে কাজের মূল্যায়ন এখনো ‘আউটপুট’ বা ফলাফলের পরিবর্তে ‘সময়’ দিয়ে করার প্রবণতা বেশি। এনজিওগুলোতে অনেক সময় মাঠ পর্যায়ের কাজ শেষে অফিসে এসে দৈনিক আদায় রেজিস্ট্রার পোস্টিং বা ভাউচার লিখতে হয়। কেউ যদি দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুত কাজ শেষ করে ঠিক সময়ে অফিস ত্যাগ করতে চান, তবে তাকে প্রায়ই বক্রদৃষ্টিতে দেখা হয়। অথচ দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে থাকলেই যে কাজের গুণগত মান বাড়ে না, এই সত্যটি আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই।
প্রশাসনিক কাঠামোতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খুশি রাখার একটি সূক্ষ্ম চাপ কর্মীদের ওপর সবসময় থাকে। বসের আগে অফিস থেকে বের হওয়াকে অনেক সময় ‘বেয়াদবি’ বা ‘কাজে অনীহা’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এনজিওগুলোতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ মিটিং বা শেষ মুহূর্তের ‘ডেডলাইন’ সামলানোর দোহাই দিয়ে অধস্তন কর্মীদের বসিয়ে রাখার এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা অনেক সময় প্রয়োজনীয়তার চেয়ে প্রদর্শনে বেশি সীমাবদ্ধ।
অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজের সুষম বণ্টন বা আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নেই। অগোছালো পরিকল্পনা ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে যে কাজ আট ঘণ্টায় শেষ করা সম্ভব, সেটি গিয়ে ঠেকে ১২ ঘণ্টায়। এনজিও সেক্টরে প্রায়ই ‘জরুরি মিটিং’ বা ‘অপ্রত্যাশিত ভিজিট’-এর দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত সময় কেড়ে নেওয়া হয়, যা মূলত কর্মপরিকল্পনার দুর্বলতাই প্রকাশ করে।
আমাদের সমাজে ‘ব্যস্ত থাকা’কে সফলতার সমার্থক মনে করা হয়। রাত ১০টা পর্যন্ত অফিস করে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে গর্ব করে বলা হয়, “আজ অনেক কাজ ছিল।” কিন্তু উন্নত বিশ্বে দক্ষতা মাপা হয় কাজ শেষ করার দ্রুততা ও মানের ওপর। আমাদের মনে রাখতে হবে, কাজ জীবন নয়, জীবনের একটি অংশ মাত্র।
দীর্ঘক্ষণ অফিস করার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনে। পরিবারকে সময় দিতে না পারা, বিশ্রামহীনতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবক্ষয় কর্মীদের ধীরে ধীরে কর্মক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এনজিওর উদ্দেশ্য যেখানে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সেখানে সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিজস্ব জীবনমান যদি নিম্নগামী হয়, তবে!
আধুনিক কর্মদর্শন বলছে—“কতক্ষণ অফিসে ছিলে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কতটা কার্যকর কাজ করতে পেরেছ।” দেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিওগুলোর উচিত এখন থেকে ঘণ্টার বদলে দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং নমনীয় কর্মঘণ্টা চালুর মাধ্যমে কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
দীর্ঘক্ষণ কাজ করা সবসময় নিষ্ঠার প্রতীক নয়; বরং এটি অনেক সময় জনবল সংকট, অদক্ষতা বা ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ, যেখানে কর্মী সতেজ মস্তিষ্কে কাজ করতে পারবে। কারণ একজন হাসিখুশি ও সুস্থ কর্মী একজন ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত কর্মীর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কার্যকর।
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন নগদ/বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩