মো. ফয়সাল আহমেদ, নিজস্ব প্রতিবেদক:— টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী ইউনিয়নের মালিরচালা এলাকায় গজারী বনের কলাবাগানের ভেতরে আবারও অবৈধভাবে সীসা উৎপাদনকারী কারখানা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।
হাতের ডান পাশে স্থাপিত ওই কারখানায় কয়েকটি চুলায় পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা উৎপাদন করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ছাইয়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি কৃষকদের মধ্যে গবাদিপশু, বিশেষ করে গরু মারা যাওয়ার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, লিটন ভূঁইয়া ও তার সহযোগীদের ছত্রচ্ছায়ায় পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে ওই কারখানায় সীসা উৎপাদন করা হচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কারখানাটির মালিক গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার চাকুলী গ্রামের রহমতুল্লাহ শ্যামল ও তার ভাই ফজলে রাব্বি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এর আগেও একই এলাকায় একাধিকবার অবৈধ সীসা উৎপাদনকারী কারখানার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬ মার্চ ২০২৩ তারিখে পরিবেশ অধিদপ্তর, টাঙ্গাইল, হাবিবুর নামের এক ব্যক্তির অবৈধ সীসা উৎপাদনকারী কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৩১৯ বস্তা সীসা জব্দ করে।
পরবর্তীতে আবারও আইন অমান্য করে অন্য মালিকের মাধ্যমে কারখানাটি চালু করা হলে ২৭ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে পরিবেশ অধিদপ্তর দুটি কারখানা উচ্ছেদ করে।
এ ছাড়া অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ায় ১ জুলাই ২০২৫ (মঙ্গলবার) পুনরায় অভিযান চালিয়ে আরও দুটি কারখানা উচ্ছেদ করা হয় বলে এলাকাবাসী জানান।
তাদের অভিযোগ, বারবার অভিযান ও উচ্ছেদের পরও বর্তমানে আবারও একটি অবৈধ কারখানা স্থাপন করে পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে সরকারি নির্দেশনা ও পরিবেশ আইন প্রকাশ্যেই অমান্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রতন, মো. আয়নুল হক ও মো. জাবেদ আলী অভিযোগ করে বলেন, গত কয়েক দিন ধরে আবারও পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা উৎপাদন শুরু হয়েছে। কারখানা থেকে বের হওয়া অ্যাসিডের ঝাঁজালো ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
তারা বলেন, বিশেষ করে রাতে ব্যাটারির প্লেট কাঠ ও কয়লার আগুনে পোড়ানোর সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এ সময় আশপাশের বাড়িঘরে অবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকের চোখ-মুখে জ্বালাপোড়া হয় এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এলাকাবাসী আরও জানান, কারখানা থেকে নির্গত ছাই বাতাসের সঙ্গে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এতে কৃষক ও গবাদিপশুর মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
তাদের আশঙ্কা, ওই ছাইয়ে দূষিত ঘাস গরু খেলে গবাদিপশুর মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে ছাই বাতাসে যত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে, সেই এলাকার ঘাস গবাদিপশুকে খাওয়ানো নিয়েও কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এ কারখানার কারণে গজারী বনের গাছপালা, কৃষিজমি, ফলদ গাছ এবং বিলের মাছের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
পাশাপাশি এলাকায় বসবাসকারী শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয়দের আরও দাবি, কারখানার মালিক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে তারা ভয় পান। তাদের অভিযোগ, অভিযুক্তদের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের যোগসাজশ থাকায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এলাকাবাসীর বক্তব্যের পর গুগলে সার্চ করে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুরাতন ব্যাটারির প্লেট আগুনে পুড়িয়ে সীসা তৈরির কারখানার আশপাশে গবাদিপশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে অবৈধভাবে সীসা উৎপাদনের ফলে বাতাস, মাটি ও পানিতে মারাত্মক সীসা দূষণ ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের দূষণ দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
চিকিৎসকদের মতে, সীসা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত একটি ভারী ধাতু। দীর্ঘদিন সীসার সংস্পর্শে থাকলে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে, শেখার সক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে রক্তস্বল্পতা, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও সীসা দূষণ মা ও গর্ভস্থ শিশুর জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
ইউনিসেফ ও পিওর আর্থের যৌথ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের প্রতি তিনজন শিশুর মধ্যে প্রায় একজনের রক্তে উদ্বেগজনক মাত্রায় সীসা পাওয়া যায়। বাংলাদেশেও অবৈধভাবে ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) শিশুস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য কারখানার মালিক ফজলে রাব্বির মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন এবং গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে, কারখানার অপর মালিক রহমতুল্লাহ শ্যামল বিভিন্ন সময়ে তার ম্যানেজ করা কিছু কথিত সাংবাদিকদের দিয়ে ফোন করান বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এলাকার সচেতন মহল অবিলম্বে অবৈধ সীসা উৎপাদনকারী কারখানাটি উচ্ছেদ, কারখানার মালামাল জব্দ, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন নগদ/বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩