মেডিকেলে সুযোগ না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে ৪৭তম বিসিএসে লাইভস্টোক ক্যাডার—মেহেবুল হাসানের অনুপ্রেরণার গল্প
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অল্পের জন্য সুযোগ হাতছাড়া, ৪৬তম বিসিএস প্রিলিমিনারিতে ব্যর্থতা, দীর্ঘ ছয় মাস পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, সামাজিক কটূক্তি এবং অনিশ্চয়তার অন্ধকার—এসব বাধা পেরিয়ে অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে লাইভস্টোক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার নতুন অনন্তপুর গ্রামের মেধাবী তরুণ মেহেবুল হাসান। একই সঙ্গে তিনি সহকারী পরিচালক পদ এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদেও সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
১৯৯৮ সালের ২৩ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করা মেহেবুল হাসান ২০১৪ সালে উলিপুর এম.এস. স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০১৬ সালে রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন (ডিভিএম) কোর্সে ভর্তি হন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিসিন বিষয়ে এমএস সম্পন্ন করেন এবং Mycoplasma Gallisepticum বিষয়ে গবেষণার জন্য NST Fellowship অর্জন করেন।
৪৬তম বিসিএসে ব্যর্থতা, ৪৭তম বিসিএসে ঘুরে দাঁড়ানো
মেহেবুল হাসানের বিসিএস যাত্রা শুরু হয় ৪৬তম বিসিএস দিয়ে। তখন ইন্টার্নশিপ চলমান থাকায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ হয়নি। ২০২৪ সালের ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় প্রায় ৯৪ নম্বর পেয়েও তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
এরপর দেশের আন্দোলন-পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত শারীরিক জটিলতার কারণে প্রায় ছয় মাস বাড়িতে থাকতে হয়। প্রয়োজনীয় বইপত্র রাজশাহীতে থাকায় পড়াশোনাও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ৪৭তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তিনি আবার রাজশাহীতে ফিরে নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি শুরু করেন।
তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই—যেভাবেই হোক ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পাস করতে হবে।
মেডিকেলে না পড়ার আক্ষেপই হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণা
২০১৮ সালের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ৭৩.৭৫ নম্বর পেয়েও দ্বিতীয়বার পরীক্ষার্থী হওয়ায় ৫ নম্বর কর্তনের কারণে তাঁর স্কোর নেমে আসে ৬৮.৭৫-এ। অপেক্ষমাণ তালিকায় থেকেও মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাননি।
এই ব্যর্থতার কারণে পরিবারকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। গ্রামের মানুষের নানা মন্তব্য, আত্মীয়-স্বজনের প্রশ্ন এবং মায়ের চোখের জল আজও তাঁকে নাড়া দেয়। তাহাজ্জুদের নামাজে ছেলের সফলতার জন্য মায়ের কান্নার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেই দৃশ্যই তাঁকে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে।
সাফল্যের পেছনে স্ত্রী ও পরিবারের অক্লান্ত ত্যাগ
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বিয়ের পর বিসিএস প্রস্তুতির পুরো সময়জুড়ে তাঁর স্ত্রী ছিলেন সবচেয়ে বড় সহযাত্রী। বাজার করা, রান্না, সংসার পরিচালনাসহ প্রায় সব দায়িত্ব তিনি একাই সামলেছেন, যাতে স্বামী নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়াশোনা করতে পারেন।
অন্যদিকে বাবা-মাও নিয়মিত প্রয়োজনীয় সবকিছু পৌঁছে দিয়েছেন। কী প্রয়োজন, কখন প্রয়োজন—ছেলেকে বলতে হয়নি; সবকিছুই তারা আগেভাগে নিশ্চিত করেছেন।
৪৭তম বিসিএসের ভাইভা শেষে নিজেকে ব্যর্থ মনে হয়েছিল মেহেবুলের। কিন্তু তখনও পরিবার তাঁকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। বরং তাঁরা বলেছেন, “তুমি ভাইভা পর্যন্ত পৌঁছেছ—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।”
‘চকলেট নোট’ই ছিল প্রস্তুতির মূল অস্ত্র
প্রস্তুতির সময় তিনি প্রতিটি বিষয়ের ছোট ছোট সারসংক্ষেপ তৈরি করতেন। বন্ধু ও জুনিয়ররা মজার ছলে এই নোটগুলোর নাম দিয়েছিল ‘চকলেট নোট’।
এই নোটই দ্রুত রিভিশনের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে। এখনও যেকোনো প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আগে তিনি এই নোটগুলোকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।
কঠিন প্রশ্নেও হারাননি সাহস
৪৭তম বিসিএস প্রিলিমিনারির আগের রাতে তাঁর এক মুহূর্তও ঘুম হয়নি। পরীক্ষার হলে গিয়ে আইসিটি ও বাংলা অংশের প্রশ্ন দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১২০টি প্রশ্নের উত্তর দেন এবং কিছু ঝুঁকি নিয়ে আরও কয়েকটি উত্তর করেন।
পরদিন অনলাইন বিশ্লেষণে নিজের সম্ভাব্য নম্বর প্রায় ১১৫.৫ দেখে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। পরে দেখা যায়, কাট মার্কস ছিল প্রায় ৯৫ এবং তিনি সফলভাবে প্রিলিমিনারি উত্তীর্ণ হন।
লিখিত পরীক্ষায় নিজস্ব কৌশল
লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রচলিত বইয়ের পরিবর্তে তিনি নিজেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্বাচন করেন। এলডিসি উত্তরণ, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাংলাদেশের অর্থনীতি—এসব বিষয়ে বই ও ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিজের ভাষায় নোট তৈরি করেন। পাশাপাশি নিয়মিত লিখিত গণিতের অনুশীলন চালিয়ে যান।
ফুটবল দেখেই ইংরেজিতে দক্ষতা
মেহেবুল হাসানের মতে, ইংরেজি শেখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিজের আগ্রহের বিষয়কে কাজে লাগানো।
তিনি নিয়মিত বার্সেলোনার খেলা দেখতেন। ম্যাচ শেষে বিভিন্ন ইংরেজি বিশ্লেষণ, নিবন্ধ ও মন্তব্য পড়তেন এবং নিজেও ইংরেজিতে মতামত লিখতেন। কোনো পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নয়, বরং নিজের আগ্রহ থেকেই এই অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এই অভ্যাসই লিখিত পরীক্ষায় ইংরেজি অংশে তাঁকে অনেক এগিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, “ইংরেজি শেখার জন্য নিজের আগ্রহের বিষয় খুঁজে নিন। যেটা ভালো লাগে, সেটাই ইংরেজিতে পড়ুন। শেখাটা তখন আনন্দের হয়ে যাবে।”
চাকরি নয়, রিজিকের একটি মাধ্যম
নতুন চাকরিপ্রত্যাশীদের উদ্দেশে মেহেবুল হাসানের বার্তা, বিসিএস কিংবা অন্য যেকোনো সরকারি চাকরি রিজিক অর্জনের একটি মাধ্যম মাত্র। তাই চাকরিকে অতিরিক্ত গৌরবের বিষয় হিসেবে না দেখে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, “রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত। তাই চেষ্টা চালিয়ে যান, এবং কখনো হতাশ হবেন না।”
বর্তমানে তিনি ৫০তম বিসিএসের ভাইভা প্রত্যাশী। সংগ্রাম, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং পরিবারের অকৃত্রিম ভালোবাসায় গড়ে ওঠা তাঁর এই সাফল্যের গল্প নিঃসন্দেহে হাজারো চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন নগদ/বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩