
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞানচর্চার স্থান নয়; এটি মানবিকতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার জায়গা। সেখানে একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার প্রতীক না হয়ে ভয়ের কারণ হয়ে ওঠেন, তখন তা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির অনৈতিক আচরণ নয়—পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি বা এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো আপসের সুযোগ নেই।
সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন—মাত্র তিন মাসে ৭১টি যৌন হয়রানির অভিযোগ শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পর্যায় থেকে মোট ৯২৬টি অভিযোগ জমা পড়ে, যার মধ্যে ৮৪৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যান দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পূর্ণ চিত্র নয়। পরিকল্পিত ২০ হাজার ১৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪৪৭টিতে। ফলে বাস্তব চিত্র আরও গভীরভাবে অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—অভিযোগের পর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, অভিযোগ করার নিরাপদ পরিবেশ আদৌ আছে কি না। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী যদি ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবের কারণে মুখ খুলতে না পারে, তাহলে অভিযোগের সংখ্যা কম হওয়াকে নিরাপদ পরিবেশের প্রমাণ বলা যায় না।
২০০৯ সালের ঐতিহাসিক রায়ে উচ্চ আদালত কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা ও অভিযোগ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কমিটিতে ন্যূনতম পাঁচ সদস্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী সদস্য এবং সম্ভব হলে নারী প্রধান রাখার বিষয়টিও নির্দেশনায় ছিল। অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছিল।
প্রশ্ন হলো—দেড় দশক পরও যদি কোথাও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেই নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে?
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু নামমাত্র কমিটি নয়, প্রশিক্ষিত ও কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ গ্রহণে গোপনীয়তা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে অভিযোগ চাপা দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, অভিযুক্তের ন্যায্য আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত।
একটি শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদার চেয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের তথাকথিত সুনাম বড় হতে পারে না। এখন সময় এসেছে ঘোষণা করার—যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা। লোকদেখানো কমিটি নয়, চাই কার্যকর প্রতিরোধ; নীরবতা নয়, চাই নিরাপদ অভিযোগ ও ন্যায়বিচার।
—এম নজরুল ইসলাম খান
লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষক
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন নগদ/বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩