স্বপ্ন থেকে সাফল্যে: কৃষক পরিবারের সন্তান মো. সাদেক আলীর ৪৬তম বিসিএসে লাইভস্টক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্তির অনন্য অর্জন
মিজানুর রহমান বিশেষ প্রতিবেদন:অদম্য অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিকূলতাকে জয় করার দৃঢ় মানসিকতা—এই চারটি গুণের অসাধারণ সমন্বয়ে বিসিএসের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার সন্তান মো. সাদেক আলী। কৃষক পরিবারের সাধারণ এক ছেলে থেকে ৪৬তম বিসিএসে লাইভস্টক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার এই যাত্রা আজ অসংখ্য তরুণ-তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণার গল্প।
মো. সাদেক আলীর জন্ম বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানার অন্তর্গত চন্দনপুর তালুকদারপাড়ায়। তাঁর বাবা মো. শাহজাহান আলী মণ্ডল একজন কৃষক এবং মা মোছা. সাজেদা একজন গৃহিণী। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেজো। বাবা নিরক্ষর হওয়ায় এবং পারিবারিক বাস্তবতার কারণে ছোটবেলা থেকেই তিনি নানাবাড়িতে বেড়ে ওঠেন।
তাঁর শিক্ষাজীবনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রয়েছে অভিভাবকতুল্য শিক্ষক ও মামা মো. এনামুল হকের। তাঁর স্নেহ, দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণায় সাদেক আলী নিজ গ্রামের বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণিতে সাধারণ বৃত্তি অর্জন করেন এবং এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ লাভ করেন। পাশাপাশি শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও মামা মো. ছাইফুল ইসলামের অবদানও তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি ভর্তি হন মহাস্থান মাহীসওয়ার কলেজে। কলেজজীবনে প্রায় ছয় মাস অসুস্থ থাকার কারণে ইয়ার চেঞ্জ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। কিন্তু সেই প্রতিকূলতা তাঁর শিক্ষাজীবনের গতি থামাতে পারেনি। আল্লাহর অশেষ রহমতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ওই কলেজের একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রিতে সুযোগ পেলেও পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন (ডিভিএম) কোর্সে ভর্তি হন এবং সফলতার সঙ্গে অনার্স সম্পন্ন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই বিসিএসের স্বপ্নকে সামনে রেখে নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতেই তাঁর বিসিএস প্রস্তুতির দৃঢ় ভিত্তি গড়ে ওঠে। অনার্স শেষ করার পর মাস্টার্সে ভর্তি না হয়ে চাকরির প্রস্তুতির জন্য ঢাকায় চলে আসেন। কিন্তু রাজধানীতে জীবনযুদ্ধ ছিল অত্যন্ত কঠিন। পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁকে একসঙ্গে তিন থেকে চারটি টিউশনি করতে হয়েছে। এই কঠিন সময়ে তাঁর বন্ধু মো. শাহীন সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন।
বিসিএসের পথও তাঁর জন্য সহজ ছিল না। ৪৫তম বিসিএসে ভাইভা পর্যন্ত গিয়েও চূড়ান্তভাবে সফল হতে পারেননি। পরে জনতা ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকে চাকরির সুযোগ পান। তবে স্বপ্ন থেকে সরে যাননি। অবশেষে ৪৬তম বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করে লাইভস্টক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।
এরপর ৪৭তম বিসিএসে আবারও ভাইভা পর্যন্ত গিয়েও সফল হতে পারেননি। বর্তমানে তিনি ৫০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অর্জনের প্রত্যাশায় নিরলসভাবে এগিয়ে চলেছেন।
মো. সাদেক আলী বলেন, "জীবনে ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু সেই ব্যর্থতাকে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারলেই একদিন সফলতা ধরা দেয়। আমি সকলের কাছে দোয়া চাই, যেন দেশ ও মানুষের সেবায় নিজেকে আরও ভালোভাবে নিয়োজিত করতে পারি।"
মো. সাদেক আলীর এই সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে—প্রতিকূলতা কখনোই স্বপ্নপূরণের পথে শেষ বাধা নয়। দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, নিয়মিত পরিশ্রম এবং আল্লাহর ওপর ভরসা থাকলে সাফল্য একদিন অবশ্যই ধরা দেয়।
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন নগদ/বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩