
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬,অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট গ্রহণ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য এরই মধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এসব প্রচার চালাচ্ছে। সরকারের নির্দেশ অনুসারে রাজধানীতে ব্যাংকের শাখাগুলোর সামনে দেখা যাচ্ছে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যানার।খবর আইবিএননিউজ।
স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষকদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে সরকারি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। একই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রতিও।
এসব প্রচারে উল্লেখ আছে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী কী পাওয়া যাবে, সেসবের বিস্তারিত। আর ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না, তেমন কথাও উল্লেখ থাকছে প্রচারে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গণভোটে সরকারের ভূমিকা নিয়ে আইনাঙ্গন, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইনে চলছে নানামুখী আলোচনা–সমালোচনা।
সরকার কোনো পক্ষে প্রচার চালাতে পারে না: জেড আই খান পান্না, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী
নির্বাচনে সরকারের নিউট্রাল থাকার কথা। সরকার কোনো পক্ষে প্রচার চালাতে পারে না। কিন্তু তারা একটা পক্ষ নিয়ে নিয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে সরকার। এটা বেআইনি। কিন্তু আইনি-বেআইনির দাম তো এই সরকারের কাছে নাই। যাদের নিউট্রাল থাকার কথা, মানে সরকারের নিউট্রাল থাকার কথা, কিন্তু তারা নিউট্রাল থাকছে না।
নির্বাচনে প্রচার চালানোর কথা আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে। কিন্তু তারা একটা পক্ষে এরই মধ্যে প্রচার শুরু করেছে। এটা ক্লিয়ার ভায়োলেশন।
সরকার জনগণের টাকায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। এটা একদম অনৈতিক। কারণ জনগণের যে টাকায় সরকার প্রচার চালাচ্ছে, সেখানে ‘না’ সমর্থকের টাকাও তো আছে। তার মানে তার টাকায় তার বিরুদ্ধেই প্রচার চালাচ্ছে সরকার।
তারপর শিক্ষক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার করতে বলেছে সরকার। কিন্তু ভোটের দিন তাদের দিয়েই নিরপেক্ষ ভোট গ্রহণ করার কথা।
এবারের গণভোট দেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নে: মুনিরা খান, নির্বাচন বিশ্লেষক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ফেমার প্রেসিডেন্ট
এবারের গণভোটটা বাংলাদেশের জন্য একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে এমন গণভোট আমরা আগে কখনো দেখিনি। গণভোট মানে জনগণের সরাসরি মতামত—এই ধারণাটাই আমাদের কাছে নতুনভাবে আসছে। আমার যতটুকু বোঝা, এই গণভোটটা কারও ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে হচ্ছে না; এটা পুরো দেশের মানুষের স্বার্থে হচ্ছে।
এ দেশে আগে যেসব গণভোট হয়েছে, সেগুলোতে কোনো না কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এবার বিষয়টা আলাদা। একটা বড় আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসেছে, আর তারা সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে বসে দীর্ঘ সময় ধরে সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেছে। এখানে কেউ জোর করে আসেনি, কেউ আপত্তিও করেনি। সব দলই তাদের চিন্তা, মতামত, বুদ্ধি দিয়েছে।
এই সংস্কার করতে দেশের অনেক সময়, টাকা আর শ্রম খরচ হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—এই সংস্কারগুলো জনগণের সামনে কে তুলে ধরবে? বাস্তবতা হলো, যারা এটা করেছে, তারাই তো তুলে ধরবে। অন্তর্বর্তী সরকার ছাড়া আর কারও পক্ষে এটা করা সম্ভব না। কাজেই এখানে একটা দায়িত্ব আছে। তারা যদি মনে করে এই সংস্কার দেশের জন্য ভালো, তাহলে জনগণকে সেটা বোঝানো, জানানো তাদের কর্তব্য। এতে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ নেই। তারা তো নিজেরাই কিছুদিন পর চলে যাবে। তারা শুধু চায়, এত কষ্ট করে করা কাজটা যেন ব্যর্থ না হয়।
সরকারের এক পক্ষে প্রচার চালানোটা বেআইনি ও অনৈতিক: মনজিল মোরসেদ, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী
আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে সরকার। এটা ন্যক্কারজনক। স্পষ্টতই বেআইনি ও অনৈতিক। বেআইনি বলছি কয়েকটি কারণে। সরকারের নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করার কথা। তাদের কোনো পক্ষে প্রচার চালানোর কথা না। সরকার যখন জনগণকে বলছে যে হ্যাঁ/না ভোটের মাধ্যমে মতামত দিন–তার মানেই তো এটা প্রভাবমুক্ত হবে। কিন্তু সরকার কোনো পক্ষে প্রচার চালালে আর তো নিরপেক্ষ বা প্রভাবমুক্ত নির্বাচন হচ্ছে না। দেশে আগেও গণভোট হয়েছে, নির্বাচন আয়োজন করে সরকার জানতে চেয়েছে যে অমুক বিষয়টি আপনি চান নাকি চান না?–হ্যাঁ/না ভোটের মাধ্যমে জবাব দিন। কিন্তু সরকার কখনো কোনো পক্ষে প্রচার চালায়নি। এখন যেভাবে সরকার একটা পক্ষে গিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে¬–এটা এক কথায় ন্যক্কারজনক।
এর ফলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বেশি পেলেও তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এই ভোটের ফলাফল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সরকার সেই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এখন দেশে আইনের শাসন নেই। তাই হয়তো কেউ সরকারের এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কিন্তু কোনো না কোনো সময় যে কেউ এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। ১৯৭১-এ আমরা তা দেখেছি। ১৯৯০ সালে দেখেছি। সর্বশেষ ২০২৪ সালেও দেখেছি।
বেআইনি বলার আরেকটা কারণ হচ্ছে–শিক্ষক বা ব্যাংক কর্মকর্তাদের ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে বলা হয়েছে। অথচ ভোট গ্রহণও করা হবে তাদের মাধ্যমে। তার মানে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে যারা প্রচার চালিয়েছেন, তাদের মাধ্যমেই ভোট গ্রহণ করা হবে। এটাও তো নিরপেক্ষতা হারিয়েছে।
আবার নির্বাচন কমিশন যে তফসিল দিয়েছে, সেখানে বলেই দিয়েছে যে নির্বাচনের প্রচার করা যাবে ২২ জানুয়ারি থেকে। কিন্তু সরকার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এরই মধ্যে প্রচার শুরু করে দিয়েছে। তাহলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হলো কোথায়! তা ছাড়া সরকার সরাসরি আইন ভঙ্গ করছে। এখানে হয়তো বলা হবে যে সরকার জনগণের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে, তাই এটা বেআইনি হচ্ছে না। কিন্তু যিনি ‘না’ ভোটের পক্ষে, তিনিও তো জনগণের অংশ। সরকারের এই প্রচার তো তার পক্ষে না, বরং সরাসরি বিপক্ষে। তাহলে জনগণের কাজ– এমন দোহাই দিয়ে নির্দিষ্ট তারিখ ২২ জানুয়ারির আগে প্রচার চালানোটা সরকারের আইনবহির্ভূত আরেকটি পদক্ষেপ।
আর অনৈতিক বলছি, কারণ সরকার জনগণের টাকায় ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু যারা ‘না’ ভোটের সমর্থক, এই টাকায় তো তাদেরও অংশ আছে। তার মানে ‘না’-এর পক্ষের ভোটারের টাকায় ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে সরকার। তাই এটা অনৈতিক।
‘হ্যাঁ’ বা ‘না’–সেই সিদ্ধান্ত ভোটারের ওপরই থাকা উচিত: জেসমিন টুলী, নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশ্লেষক
তফসিল ঘোষণার পর এখন আমরা এমন একটা পর্যায়ে আছি, যেখানে নির্বাচন কমিশন তার জায়গা থেকে কাজ করছে, সরকারও করছে। কিন্তু গণভোটের বিষয়টা একটু ভিন্ন। এখানে তো হ্যাঁ-না ভোট। প্রশ্ন হচ্ছে, এই হ্যাঁ-না ভোটে সরকার কি কোনো পক্ষ নিতে পারে?
এটা আমার কাছে খুবই জটিল একটা বিষয়। কারণ বাস্তবতা হলো, এই সংস্কার প্রক্রিয়াটা মূলত এই সরকারেরই উদ্যোগে হয়েছে। কমিশন গঠন থেকে শুরু করে আলোচনার আয়োজন, সবকিছুর দায়িত্ব সরকারই নিয়েছে। একপর্যায়ে যখন গণভোটের প্রশ্নে ঐকমত্য হয়নি, তখন সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকেও বলেছিল। কিন্তু তারা বলেছিল, এত অল্প সময়ে এটা সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত ব্যালট কেমন হবে, প্রশ্ন কী হবে–এই সিদ্ধান্তগুলোও সরকারই নিয়েছে।
এ কারণে মাঝে মাঝে মনে হয়, এটা সরকারেরই ফসল। এখন সেই ফসল জনগণের কাছে কীভাবে তুলে ধরা হবে, সেটাই মূল প্রশ্ন। আমার মতে, সরকার সংস্কারের সুফল, ইতিবাচক দিকগুলো ব্যাখ্যা করতে পারে। বলতে পারে–এই সংস্কার হলে ভবিষ্যতে কী লাভ হতে পারে। কিন্তু সরাসরি বলা যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন বা ‘না’ ভোট দিন–এটা করা ঠিক হবে না। কারণ সরকার যদি প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালায়, তাহলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সরকারি যন্ত্র ব্যবহার করে ভোটকে প্রভাবিত করার অভিযোগ আসতে পারে। সবচেয়ে ভালো হবে–সরকার তথ্য দেবে, ব্যাখ্যা দেবে আর সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি ভোটারের ওপর ছেড়ে দেবে।
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন নগদ/বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩