রহমান,শেরপুর জেলা প্রতিনিধি:
শেরপুরের গারো পাহাড়সংলগ্ন সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে আগুন লাগানো রোধে ব্যতিক্রমধর্মী সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। শুক্রবার দিনব্যাপী “হাতির খবর ও সচেতনতা গ্রুপ”-এর উদ্যোগে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত সড়ক ও বনসংলগ্ন এলাকায় সতর্কতামূলক ব্যানার স্থাপন করা হয়।
এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে বিউটি অফ ঝিনাইগাতী, প্রশাখা, আপন শিক্ষা পরিবার, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম, গ্রিন ইনিশিয়েটিভ সিংগাবরুনা সহ আরও বেশ কয়েকটি পরিবেশভিত্তিক সংগঠন। স্থানীয় তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কর্মসূচিকে একটি সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগে রূপ দেয়।
শুষ্ক মৌসুমে গারো পাহাড়ের বনভূমি একটি সংকটময় সময় অতিক্রম করে। গাছের পাতা ঝরে গিয়ে বনভূমি হয়ে ওঠে দাহ্য, মাটির আর্দ্রতা কমে যায়, শুকিয়ে পড়ে ঝর্ণা ও জলাধার। এই প্রাকৃতিক দুর্বলতার সুযোগে কিছু অসচেতন ব্যক্তি বা দুষ্কৃতিকারী আগুন লাগিয়ে দেয়, যা দ্রুত বিস্তার লাভ করে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নেয়।
ঈদ-উল ফিতরকে সামনে রেখে আয়োজিত এই কর্মসূচির একটি মানবিক দিকও রয়েছে। আয়োজক সংগঠনের অন্যতম সংগঠক রহমত আলী বলেন, “ঈদ মানে আনন্দ ও ভাগাভাগির সময়। কিন্তু আমাদের এই আনন্দ যেন বনের প্রাণীদের জন্য দুর্ভোগের কারণ না হয়। আমরা চাই, মানুষের পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর মাঝেও শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।”
ব্যানার স্থাপন কার্যক্রমটি শুরু হয় নালিতাবাড়ীর পানিহাটা চার্চ এলাকা থেকে। পরে ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী সড়কের বিভিন্ন নির্জন ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে এগুলো স্থাপন করা হয়; যেখানে আগুন লাগানোর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
বিউটি অফ ঝিনাইগাতীর সভাপতি পারভেজ মিয়া বলেন, “ঈদের সময় শহর থেকে মানুষ গ্রামে ফিরে আসে, অনেকে পাহাড়ি এলাকায় ঘুরতে যায়। কিন্তু অসচেতনভাবে ফেলা সিগারেটের আগুন বা ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে পুরো জীববৈচিত্র্যের ওপর।”
এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম মধুটিলার সভাপতি আরফান আলী বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে বলেন, “বনে আগুন লাগলে প্রথম আঘাত পড়ে খাদ্য শৃঙ্খলে। হাতিসহ বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীরা খাদ্যের অভাবে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে মানুষ-হাতি সংঘাত বেড়ে যায়, যা উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক।”
পরিবেশ গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজের প্রতিনিধি শাহরিয়ার হোসেন শাহপরান বলেন, “বন আগুন কোনো একক ক্ষতি নয়; এটি পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর আঘাত হানে। মাটির অণুজীব থেকে শুরু করে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী সবাই এর শিকার হয়। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব মানুষের জীবনেও ফিরে আসে।”
পরিবেশবাদী সংগঠনের সদস্য ওয়াসিম মিয়া কর্মসূচিকে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “আইন প্রয়োগের পাশাপাশি এমন সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা খুব জরুরি।'
একজন স্থানীয় তরুণ স্বেচ্ছাসেবী লিয়াকত হোসেন বলেন, “আমরা চাই না প্রতি বছর একই সমস্যা দেখব। আমাদের বন আমাদেরই রক্ষা করতে হবে; এটা এখন দায়িত্বের জায়গা।”
বনে আগুন শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতি নয়, দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্য, মাটির উর্বরতা, জলচক্র এবং জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে গারো পাহাড়ের মতো সংবেদনশীল ইকোসিস্টেমে এর প্রভাব আরও গভীর।
ঈদের আনন্দকে প্রকৃতি-বান্ধব রাখতে এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে মানুষের উৎসব যেন বনের নীরব প্রাণীদের জন্য আতঙ্কের কারণ না হয়।
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন নগদ/বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩