স্বপ্ন থেকে সাফল্যে: ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে ২৪তম স্থান অর্জন খুলনার এস. এম. মেহেদী হাসানের
মিজানুর রহমান,বিশেষ প্রতিবেদন:অদম্য অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং লক্ষ্য অর্জনের দৃঢ় সংকল্প থাকলে সাফল্য একদিন ধরা দিতেই বাধ্য—এ কথারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন খুলনার কৃতি সন্তান এস. এম. মেহেদী হাসান। ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে ২৪তম স্থান অর্জন করে তিনি নিজের বহুদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
খুলনা জেলাতেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ২০১৪ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে খুলনা জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং ২০১৬ সালে খুলনা সরকারি বি.এল. কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। কলেজজীবনেই প্রি-টেস্ট পরীক্ষায় পুরো কলেজে প্রথম স্থান অর্জন করে শিক্ষক, সহপাঠী এবং পরিবারের সবার প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় তাঁদেরও ছিল ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্ন পূরণে নিজেও হয়ে ওঠেন আরও মনোযোগী ও পরিশ্রমী।
ভর্তি পরীক্ষায় মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও বাবার একান্ত ইচ্ছায় তিনি ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে খুলনা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। যদিও শুরুতে মেডিকেলের পড়াশোনার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগেছিল, তবুও ধীরে ধীরে নিজের লক্ষ্যের পাশাপাশি বিসিএস সম্পর্কেও জানাশোনা শুরু করেন।
সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, জনগণের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ, ইউনিফর্মের মর্যাদা, নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ এবং রাষ্ট্রের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। তখন থেকেই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন—চাকরি করলে পুলিশ ক্যাডারেই করবেন।
মেডিকেলের ফাইনাল প্রফ পরীক্ষার শেষ দিন বিকেলেই তিনি বিসিএস প্রস্তুতির জন্য প্রথম বইয়ের সেট কিনে আনেন। ইন্টার্নশিপ চলাকালীন বিসিএস প্রস্তুতির পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন, যা তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।
৪৫তম বিসিএস ছিল তাঁর প্রথম বিসিএস। সেখানে তিনি স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এরপর ৪৬তম বিসিএসে ভাইভা দিয়ে পুলিশ ক্যাডার পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী থাকলেও সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে তিনি ভেঙে পড়েননি। একই বিসিএসে আনসার ক্যাডারে ৬ষ্ঠ স্থান অর্জন করে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।
সেই সময় নিজের পড়ার টেবিলের দেয়ালে ছোট্ট একটি কাগজে তিনি লিখে রেখেছিলেন—“দরকার হলে ৫৪তম বিসিএস পর্যন্ত দিয়েই যাবো, তবুও ASP-ই হবো, ইনশাআল্লাহ।” এই অদম্য প্রত্যয়ই তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।
অবশেষে মহান আল্লাহর অশেষ রহমত, নিরলস পরিশ্রম এবং ধৈর্যের প্রতিদান হিসেবে ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে ২৪তম স্থান অর্জন করে তিনি নিজের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করেন।
নিজের এই অর্জনের পেছনে বাবা-মা, বিশেষ করে মা এবং তাঁর স্ত্রীর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন মেহেদী হাসান। তাঁদের ত্যাগ, অনুপ্রেরণা ও অবিচল সমর্থন তাঁকে প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে সাহস জুগিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে একজন সৎ, নিষ্ঠাবান, দায়িত্বশীল এবং জনবান্ধব সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দেশের মানুষের সেবা করতে চান। একই সঙ্গে তিনি সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন এবং প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন—প্রত্যেক পরিশ্রমী মানুষ যেন তার প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের যথাযথ প্রতিদান পায়।
এস. এম. মেহেদী হাসানের এই অনন্য সাফল্য শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, খুলনাবাসীর জন্যও গর্বের। তাঁর এই অর্জন আগামী প্রজন্মের বিসিএস প্রত্যাশীদের জন্য নিঃসন্দেহে এক অনুপ্রেরণার নাম।