বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৭:৫১ অপরাহ্ন
শিরোনাম
সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইলিয়াছ রেজা রবিনের ভোট প্রদান ‎ চট্টগ্রাম-৯ আসনে জনরায় স্পষ্ট: ভবিষ্যৎ এমপি আবু সুফিয়ান অগ্রিম বিজয়ী অভিনন্দন: হাসনাত আব্দুল্লাহ ও নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী। ভোটের আগের রাতেই কলঙ্কিত ত্রয়োদশ নির্বাচন: জামায়াতের তৎপরতায় গণতন্ত্র চরম হুমকিতে ভোটের আগের রাতেই কলঙ্কিত ত্রয়োদশ নির্বাচন: জামায়াতের তৎপরতায় গণতন্ত্র চরম হুমকিতে; বদলগাছীতে বিএনপির নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত বিএনপি সরকার গঠনে দেশের মানুষ নিরাপদ থাকবে : তানোরে মেজর শরীফ খুলনা-১ আসনে আমীর এজাজ খানের নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত, ‎ ৮ ফেব্রুয়ারি প্রাইমারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগ চুড়ান্ত ফলাফলে উত্তীর্ণ শেরপুরের কৃতি সন্তান শাহিন মিয়া! মহাদেবপুর জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত

অগ্রিম বিজয়ী অভিনন্দন: হাসনাত আব্দুল্লাহ ও নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী।

জিয়াউল ইসলাম জিয়া বার্তা সম্পাদক / ২৬ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

লেখক : ওসমান এহতেসাম

দেশজুড়ে উত্তাপপূর্ণ এক নির্বাচনী মৌসুমে দুই বিপরীত মেরুর দুই আসনে দুজন তরুণ, গতিশীল ও রূপকথার নায়কের মতো আবির্ভূত প্রার্থী বিজয়ের দিকে এগিয়ে চলেছেন স্বতঃসিদ্ধভাবে। কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং ঢাকা-৮ আসনের নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী, দুজনই নিজ নিজ রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুমাত্রিক সমীকরণ ভেঙে জনতার ম্যান্ডেট নিতে প্রস্তুত। শুধু প্রতীক বা দলীয় সমর্থন নয়, তাদের জয়ের পেছনে কাজ করছে সময়ের দাবি, প্রতিপক্ষের ভুলগুলোর সুকৌশলী ব্যবহার এবং সর্বোপরি, এক অনিবার্য গণ-আকাঙ্ক্ষা। জনাব হাসনাত আব্দুল্লাহ ও নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী আপনাদের সাদরে বরণ করে নিতে আপনাদের নিজ নিজ আসনের জনগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, তাই আমার পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম অগ্রিম বিজয়ী শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আপনাদের অভিনন্দন।

একজন পাঠক হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই অবাক হয়েছেন, হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ আমি যখন এই কলামটি লিখছি, তখন সময় ১০ ফেব্রুয়ারি বিকাল, অথচ নির্বাচন এখনো অনুষ্ঠিতই হয়নি। তার আগেই আমি দুই প্রার্থীকে অগ্রিম বিজয়ের অভিনন্দন জানিয়েছি। প্রশ্ন জাগতেই পারে, এটা কিভাবে সম্ভব? আসলে রহস্যটা এখানেই। আমি কীভাবে বুঝলাম, কুমিল্লা-৪ এর হাসনাত আব্দুল্লাহ ও ঢাকা-৮ এর নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী বিজয়ের দিকেই এগিয়ে আছেন, সেই যুক্তি ও বাস্তবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই ‘অগ্রিম অভিনন্দনের’ ব্যাখ্যা। এবার সেই রহস্যের পর্দা তোলা যাক।

প্রথমেই আলোচনা করা যাক কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনটি নিয়ে। এই আসনে হাসনাত আব্দুল্লাহকে এগিয়ে রেখেছে মূলত তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর ভুল বক্তব্য, জনগণের ম্যান্ডেট না বোঝা এবং ধারাবাহিক ভুল সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী, দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর একটি বক্তব্যই এই আসনের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। যেদিন তিনি সাংবাদিকদের বললেন, আমার সঙ্গে ওই ছেলের (হাসনাত আব্দুল্লাহর) কোনো পরিচয় নেই, আগেও ছিল না, কোনো সময়ই ছিল না, কোনো ইন্টারেস্টও নেই, এখনো চিনি না, দেখাও হয়নি’- সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম, তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এখানেই শেষ। সেদিন তার এই বক্তব্যে রাজনৈতিক বিচক্ষণতার চেয়ে অহংকার ও দাম্ভিকতার প্রকাশই ছিল বেশি। এই বক্তব্য যে দেবীদ্বারসহ সারা বাংলাদেশের মানুষ ভালোভাবে নেয়নি, তা বুঝতে পেরেছিলেন স্বয়ং ইঞ্জিনিয়ার মুন্সীর ছেলে ব্যারিস্টার রিজভিউল আহসান মুন্সী নিজেও। সে কারণেই পরবর্তীতে তাঁকে বলতে হয়েছে, তাঁর বাবার বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সমালোচনা হবেই না কেন? হাসনাত আব্দুল্লাহ তো বর্তমান সময়ের মহানায়কদের একজন। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম সারির এই যোদ্ধার সাহস, ভূমিকা ও অবদান পুরো বাংলাদেশ স্বীকার করে। যাকে সারা দেশ চেনে, তার সম্পর্কে বলা হয়- ‘চিনি না, দেখিনি’! এই বক্তব্যের পর জনগণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে, তাহলে এই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী কোথায় ছিলেন? এই আন্দোলনের কোনো বার্তাই কি তাঁর কাছে পৌঁছায়নি?

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তিনি যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও পেতেন, শুধু মাত্র এই বক্তব্যের কারণে কখনোই বিজয়ের মুখ দেখতেন না। কারণ বাংলাদেশে বারবার প্রমাণ হয়েছে, যারা অহংকারী হয়ে ওঠে কিংবা নিজের অহংকারকে প্রকাশ্যে আনতে চায়, সময় তাদের কাউকেই ক্ষমা করে না।

শেষ পর্যন্ত অনেক ঋণখেলাপি প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও, সেই ভাগ্য জোটেনি মুন্সী সাহেবের কপালে। বিএনপির মতো একটি বড় ও জনপ্রিয় দল, দেবীদ্বারের রাজনীতিতে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার থাকা সত্ত্বেও ঝরে পড়লেন নির্বাচনী মাঠ থেকেই। সমাপ্তি ঘটলো এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের।
হয়তো কেউ কেউ ‘রাজনীতির সমাপ্তি’ শব্দে আপত্তি তুলতে পারেন, কিন্তু বাস্তবতাও তো উপেক্ষা করা যায় না। বার্ধক্য শরীরে ভর করেছে, চলাফেরায় অন্যের সহায়তা নিতে হয়। সেই তরুণ রাজনীতিতে তিনি কি আর কখনোই ফিরতে পারবেন? পারবেন না। তবে আমি এই রাজনীতিবিদের দীর্ঘায়ু কামনা করি, কারণ তাঁর মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের প্রয়োজন এদেশের রাজনীতিতে এখনো আছে। তিনি দেবীদ্বারের জন্য জীবনে অনেক কিছুই করেছেন, যা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।‌ তবে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও বলতে হচ্ছে যে, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেবীদ্বারের বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং-এর রাজনীতিতে এই বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও এমনটি না হোক, সেই প্রত্যাশাই করি।

এদিকে ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন বাতিল হলেও কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে হাসনাত আব্দুল্লাহকে খালি মাঠে ছেড়ে দিতে আগ্রহী না বিএনপি। বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দীনের ট্রাক প্রতীকের পক্ষে সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছে। এই সমীকরণে প্রথমে আমারও মনে হয়েছিল, হাসনাত আব্দুল্লাহর জন্য নির্বাচনটা হয়তো কিছুটা কঠিন হয়ে উঠবে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেন ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী জসিম উদ্দীন নিজেই।

বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির সমর্থন পাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত জসিম উদ্দীনের কিছু সফল ও সীমাবদ্ধতা ছিল। সীমাবদ্ধতার দিক থেকে বলতে হয়, গণঅধিকার পরিষদ একটি নতুন রাজনৈতিক দল। ফলে বিএনপি বা জামায়াতের মতো সংগঠিত কর্মী কাঠামো ও অর্থনৈতিক শক্তি তাদের নেই। এই সংকট জসিম উদ্দীনের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট ছিল। যেহেতু পূর্বে মুন্সী সাহেব বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ছিলেন, তাই পুরো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ঘুরপাক খেয়েছে মুন্সী ও হাসনাত আব্দুল্লাহকে ঘিরে। জসিম উদ্দীন সেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন না বলেই গণমাধ্যমেও তিনি তেমন কাভারেজ পাননি। এসব কারণে তিনি অনেক দিক থেকেই দুর্বল অবস্থানে ছিলেন।
তবে ইতিবাচক দিকও কম ছিল না। জসিম উদ্দীন একজন কোরআনের হাফেজ, ভদ্র ও মিষ্টভাষী মানুষ। তিনি উত্তেজিত হন না, ব্যক্তিগত আচরণে নম্র। যারা তাঁকে কাছ থেকে চেনেন, তারা নিঃসন্দেহে তাঁকে ভোট দিতে আগ্রহী ছিলেন এমনটাই ধারণা করছি। আর যখন মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিলের পর বিএনপি জোট প্রকাশ্যে জসিম উদ্দীনকে সমর্থন দেয়, তখন তাঁর অনেক ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে ভোটের লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হয়ে ওঠার বাস্তব সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু এখানেই জসিম উদ্দীন সবচেয়ে বড় ভুলটি করেন। তিনি ধরে রাখতে পারেননি নিজের সক্ষমতা। না ব্যক্তিগতভাবে, না দলীয়ভাবে। কেন পারেননি? কারণটা খুবই সহজ।

আমি যদি আপনাদের কয়েকটি প্রশ্ন করি, হয়তো আপনারা মনে মনে তার একটা উত্তর করে নিবেন। আপনারা মনে মনে যে উত্তরটি বেছে নিবেন, তা আমার উত্তরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন, হয়তো মিলবে।
আমার প্রথম প্রশ্ন, আপনারা কোনো বিষয়ে ‘অতিরিক্ত’ পছন্দ করেন কি?
দ্বিতীয় প্রশ্ন, আপনারা ‘অহংকার’ পছন্দ করেন কি?
তৃতীয় প্রশ্ন, ‘তোষামদি’, বা সরাসরি বাংলায় তেল মারা, আপনারা কারা কারা পছন্দ করেন বা করেন না?
এই তিনটি প্রশ্নে আপনার উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে তা আমার উত্তরের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে গেছে। আর সেই দিক থেকেই দেখা যায়, জসিম উদ্দীন নিজেকে এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত করেছেন।

আমরা সবসময় প্রত্যাশা করি, আমাদের আসনে এমন একজন প্রার্থী নির্বাচিত হবেন যিনি সাহসী, বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের অধিকার আদায়কারী এবং জনগণের পক্ষে আপসহীন। কিন্তু জসিম উদ্দীনের মধ্যে সেই দৃঢ়তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। বরং আমরা দেখেছি- যিনি নিজে নির্বাচন করতে পারলেন না, সেই বিএনপির প্রার্থীকে তোষামদি করতে। নির্বাচনী মঞ্চে দেখা গেছে, মুন্সী সাহেব রাজকীয় চেয়ারে বসে আছেন, আর ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী কখনো নিচু চেয়ারে এক কোণে, কখনো মাইক হাতে দাঁড়িয়ে। এই দৃশ্যগুলো যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মানুষ কমেন্টে প্রশ্ন তোলে- ‘এখানে আসল প্রার্থী কে?’ মানুষ যদি প্রার্থীই চিনতে না পারে, তাহলে এই প্রচারণার মানে কী? আমাদের স্মরণে রাখা উচিত, আমাদের দেশের মানুষ একজন রিকশাচালককেও সম্মান দেয়, কিন্তু তোষামোদকারীকে সম্মান দেয় না, মন থেকেও না। যাকে মানুষ মন থেকে ধারণ করে না, যাকে নেতা হিসেবে মানে না। যার আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে না, তার জন্য মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবে কেন? সংসদে গিয়ে তিনি মানুষের জন্য কীই বা আনবেন?

এরপর আসুন ‘অতিরিক্ত’ শব্দটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। সম্মান দেওয়া ভালো, কিন্তু সর্বত্র অতিরিক্ত সম্মান অনেক সময় হাস্যরসের জন্ম দেয়। মুন্সী সাহেব প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সে কথা ঠিক। কিন্তু আপনি নিজেও একজন সম্মানিত প্রার্থী। আপনারা পাশাপাশি বসবেন, একে অপরকে সম্মান রেখে বক্তব্য রাখবেন। জনগণকে পরিকল্পনা জানাবেন এবং সুন্দর প্রতিশ্রুতি দেবেন, এটাই নিয়ম। তাহলে কী প্রয়োজন ছিল, আপনি মাইক ধরবেন আর উনি গাড়ির ভেতরে বসে থাকবেন! আপনি মাইক ধরবেন, উনি মঞ্চে বসে থাকবেন। আপনি মাইক ধরে উঠানে দাঁড়াবেন। আপনি বিজয়ের প্রত্যাশা করেন, অথচ আপনার নির্বাচনী প্রচারণায় একটি মাইক ধরার কর্মীও কি নেই? আপনি কেন নিজেকে কর্মীর ভূমিকায় নামিয়ে দিলেন কেন?

এবার বিশ্লেষণে ‘অহংকার’কে খুঁজে আনার চেষ্টা করব। বিএনপি’র সমর্থন পাওয়ার আগে তিনি যে যোগ্যতা ধরে রেখেছিলেন, সমর্থন পাওয়ার পর তিনি পুরোপুরি মুন্সী সাহেবের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। যেন মুন্সী সাহেবই তাঁকে ‘পাস করিয়ে দেবেন’। এতে জনগণ ক্ষুব্ধ হয়। জনগণ তখন মনে করে, এই প্রার্থীর নিজের কোনো শক্তি নেই। অথচ বাস্তবতা হলো, এই সমর্থন এসেছে কেন্দ্রীয় সমঝোতার মাধ্যমে, ভিপি নুরের নেতৃত্বে, তারেক রহমানের সিদ্ধান্তে, মুন্সী সাহেবের ব্যক্তিগত অনুগ্রহে নয়। এই সমর্থনকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে সংসদে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়াই ছিল বুদ্ধিমানের কাজ।

কিন্তু এর উল্টোটা ঘটলো। মিডিয়া কাভারেজ বাড়তেই জসিম উদ্দীনও অহংকারে ভেসে গেলেন। সাংবাদিকদের বললেন, ‘এই সময়ে আমি হাসনাত আব্দুল্লাহকে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই মনে করি না, আমার গণজোয়ার চলছে।’ এই বক্তব্যে তিনি কার্যত মুন্সী সাহেবের ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করলেন। তিনি চাইলে বলতে পারতেন- আমি একজন কোরআনের হাফেজ, রাজনীতিতে এসেছি দেবিদ্বারবাসীর জন্য কিছু করতে। হাসনাত ভাইয়ের প্রতি আমার সম্মান আছে। কিন্তু অহংকারই তাঁকে সেই পথ থেকে সরিয়ে দেয়।

অন্যদিকে হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য শুনুন- তিনি বলেন, তাঁর কাছে কোনো প্রার্থীই দুর্বল নয়, সবাই হেভিওয়েট। এখানেই পার্থক্য। যিনি ৫ আগস্টের প্রেক্ষাপটে আন্দোলনের মহানায়ক, যিনি নিঃসংকোচে রাজমিস্ত্রি বাবার পরিচয় দেন, যিনি একটি জার্সি পরেই সরকার পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠেন, যিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না হয়েও কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দ আনতে পারেন- তাঁকে আটকে রাখা যায় কী দিয়ে? সাহসী বিপ্লবীদের কখনো আটকানো যায় না, ষড়যন্ত্র ছাড়া।

দেবীদ্বারসহ দেশের মানুষের নিশ্চয়ই মনে আছে, এই সাহসটি মানুষটি কিভাবে অভিনব কায়দায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তিনি সড়কে মাছের পোনা ফেলে অভিনব কর্মসূচির মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। সেই আন্দোলনের ফলেই আজ সেই রাস্তায় উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। স্থানীয় ঠিকাদার, প্রকৌশলী ও সরকারি কর্মকর্তাদের অন্যায় বিলম্বে তিনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। শিক্ষক, শ্রমিক ও দিনমজুরদের আন্দোলনে তাঁর উপস্থিতি আজ পরিচিত দৃশ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়- হাসনাত আব্দুল্লাহর প্রতিপক্ষ যত সোচ্চার হবে, হাসনাতের অবস্থান তত শক্ত হবে, আমিও তাই মনে করি। তরুণদের সমর্থন ও জনগণের আস্থা তাঁকে বিজয়ের দিকেই এগিয়ে নিচ্ছে। আমি জানি না তিনি কতটা ঘাম ঝরাবেন, কিন্তু তিনি যে বিজয়ী হবেন- সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

ঢাকা-৮ আসনের খবর কি জানেন? এই আসনে চলছে নতুন রাজনীতির এক টাইটানিক দ্বন্দ্ব। একপাশে বিএনপির দিকপাল, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ মির্জা আব্বাস। অন্যপাশে জাতীয় নাগরিক পার্টির তরুণ, কৌশলী মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী। দেখা যাচ্ছে, অভিজ্ঞতা এবার কৌশলের কাছে হার মানতে বসেছে।

দেশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী রাজনীতিতে নতুন হলেও তার কৌশল ও দক্ষতা আন্দোলনের মতোই স্পষ্ট। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরিবর্তে প্রতিপক্ষের ভুল ও দোষকে বারবার সামনে নিয়ে আসছেন। যদিও মির্জা আব্বাস আদৌ চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত কি না, তা আমরা জানি না, যেহেতু ঢাকার বাহিরে থাকি- জানার কথাও না। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে ‘চাঁদাবাজ’ শব্দটি নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী নিজেই বলতেন, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে নাসিরুদ্দীন এটিকে এমনভাবে প্রচার করেছেন যে, এক ধরনের গণআন্দোলনের আকার নিয়েছে। কলেজ শিক্ষার্থীরা সেলফি তোলার সময়ও বলেন ‘মির্জা আব্বাস চাঁদাবাজ’, হকার থেকে নারীদের কাছে পর্যন্ত এই শব্দের প্রতিধ্বনি। সত্যতা যতটুকু থাকুক না কেন, এটি জনগণের চোখে একটি গণআন্দোলনের রূপ নেয়।

নাসিরুদ্দীন ভালো জানেন, সাধারণ মানুষ পুরানো রাজনীতির উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না- কারণ রাজনীতির প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাই তিনি প্রতিপক্ষের দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরে ভোটারদের আস্থা অর্জন করছেন।

ব্যবসায়ীদের কাছে তার বার্তা স্পষ্ট—“১২ তারিখের পর আর চাঁদা দিতে হবে না।” এভাবেই তিনি বিপরীত প্রার্থীর সমালোচনার মধ্যেই মূল সমস্যার সমাধানে নিজের প্রতিশ্রুতির বার্তা দিচ্ছেন। ফলে ব্যবসায়ী ও ভোটাররা তাকে সমর্থন দিতে উৎসাহী। কাজেই ব্যবসায়ী সমাজ ও তরুণদের ভোটে এগিয়ে থাকবেন এই সংগ্রামী যোদ্ধা পাটোয়ারী।

অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, শুধু বিএনপি মনোনীতই নয়, তিনি একজন অত্যধিক জনপ্রিয় ব্যক্তি। নাম মির্জা আব্বাস। সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী এবং সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র হিসেবে এলাকার মানুষের ওপর তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। তিন প্রজন্মের বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে রাজনীতি করার বিরল অভিজ্ঞতাও তার আছে। মির্জা আব্বাসের অবদান দেশের জন্য অসংখ্য। রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালীন, তিনি বহু উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। তার দলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পও তার নেতৃত্বে বাস্তবায়িত হয়েছে।

কিন্তু এই বহু অবদান থাকা সত্ত্বেও, বিএনপি ও মির্জা আব্বাসের স্থানীয় নেতাকর্মীরা তা তুলে ধরতে পারছেন না। ফলে নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীর সাজানো ফাঁদে পড়েছে তার কর্মীরা। নাসিরুদ্দীনের মূল ফাঁদ ছিল- মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে যত রকম সমালোচনা সম্ভব, তা বারবার প্রচার করা। যদি মির্জা আব্বাস একবারও ভুল বক্তব্য দেন বা মেজাজ খারাপ করেন, তা জনগণের চোখে নেতাকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু গুণী নেতা মির্জা আব্বাস উত্তেজিত হননি, মাঝেমধ্যে বক্তব্যের পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন। তবে তিনি প্রচারণার একদম শেষ পর্যায়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাকে (নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীকে) আমি চিনি না’। একজন লেখক হিসেবে মনে হয়, এতদিন ধরে বাকযুদ্ধ করে শেষ পর্যায়ে এসে এই কথাটি বলা প্রয়োজন ছিল না। একদম প্রথম থেকেই চিনি না বলে তর্ক এড়াতে পারতেন অথবা বাকযুদ্ধ অব্যাহত রেখে নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীর বক্তব্য ‘ভুল’ এমন ধারা ধরে রাখতে পারতেন। তবে মির্জা আব্বাস ভুল করেছেন, তাও বলা যাবে না। তবে এই ফাঁদে পড়েছেন তার কর্মীরা, বিশেষ করে যুবদল নেতা নয়ন। তার দলের নেতাকর্মীরা বিএনপি ও মির্জা আব্বাসের অর্জন তুলে ধরার বদলে নাসিরুদ্দীনের বক্তব্যের প্রতি বার কাউন্টার দিচ্ছিলেন। এভাবেই নির্বাচনী প্রচারণা কেটেছে। ফলে ঢাকা-৮ এর স্পষ্ট বার্তা হলো, নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী বারবার চাঁদাবাজির কথা বলছেন, কিন্তু মির্জা আব্বাসের পক্ষ থেকে এ বিষয়টি যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।

ফলত, নাসিরুদ্দীনের ‘চাঁদাবাজ’ শব্দের প্রয়োগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের এ শব্দ প্রয়োগের ব্যর্থতা মিলিয়ে ঢাকা-৮ এর নির্বাচনী মাঠ এখন পুরোপুরি নাসিরুদ্দীনের নিয়ন্ত্রণে।
আপনারা দেখেননি, নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে মানববন্ধন হচ্ছে, অথচ তার বিরুদ্ধে হওয়া সেই মানববন্ধনেই তিনি উপস্থিত! আর যারা তার বিরুদ্ধে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখছিলেন, তাদেরকে দিয়েই আবার তার পক্ষে ভোট চাওয়ালেন। এইটাই নির্বাচনী মাঠের আসল খেলা, ফাইনাল খেলা। কৌশল ও ব্যর্থতার মধ্যেই লড়াইটা হবে হাড্ডা হাড্ডি, তবে দিনশেষে বিজয়ী হবেন নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী।

নির্বাচন কোনো একক দল বা ব্যক্তির উৎসব নয়- নির্বাচন রাষ্ট্রের, জনগণের এবং গণতন্ত্রের। নির্বাচনে অংশ নেওয়া সকল রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও কর্মীদের জন্য রইল শুভকামনা। প্রত্যাশা একটাই—ভয়মুক্ত পরিবেশে, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতায়, অবাধ ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচন, যেখানে ব্যালটই হবে শেষ কথা। কারণ ভোটের মাধ্যমেই জনগণ তাদের প্রতিনিধি বেছে নেয়, আর সেই প্রতিনিধিত্বই রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক বৈধতা তৈরি করে।
একই সঙ্গে এ কথাও অস্বীকার করা যায় না যে, দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও গ্রহণযোগ্য ও প্রশ্নাতীত করতে পারত। অনেকেই বলেন, আওয়ামী লীগকে জনগণ চায় না; কিন্তু গণতন্ত্রে ‘চাওয়া’ বা ‘না-চাওয়া’ প্রমাণের একমাত্র উপায় হলো ভোট। জনগণ যদি না চায়, তাহলে ব্যালট বাক্সেই তার প্রতিফলন ঘটতো। রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার পথ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যেত। তাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ায় না, গণতন্ত্রের ভিতও মজবুত করে। শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রত্যাশা- রাজনীতির এই কঠিন সময়ে দেশ জিতুক, গণতন্ত্র জিতুক, আর জনগণের রায়ই হোক।

লেখক : ওসমান এহতেসাম
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম সাংবাদিক সংস্থা (চসাস) osmangonistudent5@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর