শাহ লভলী রহমান: একদিন এক অদ্ভুত নগরীর গল্প শুনেছিলাম। নগরীটির নাম ছিল ‘সম্মানপুর’। সেখানে একসময় মানুষ কথা বলার আগে শব্দ বেছে নিত, বড়দের সামনে নিজের কণ্ঠস্বর সংযত রাখত, আর ছোটদের সঙ্গে কথা বলত স্নেহ ও মমতায়। সেই নগরীতে বয়স ছিল অভিজ্ঞতার প্রতীক, আর শিষ্টাচার ছিল মানুষের চরিত্রের অলংকার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নগরীটির অদৃশ্য পরিবর্তন ঘটল। নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ আবিষ্কার করল, কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলতে পারলে নিজের উপস্থিতি বেশি জাহির করা যায়। ব্যঙ্গকে বলা হলো রসবোধ, ঔদ্ধত্যকে আত্মবিশ্বাস, আর অশিষ্টতাকে আধুনিকতা। একসময় যারা ভদ্রভাবে কথা বলত, তাদেরই কেউ কেউ সেকেলে বলে উপহাস করতে শুরু করল। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, নগরীর প্রবীণ মানুষেরা সব দেখেও চুপ করে থাকলেন। তাঁরা ভাবলেন, শিশুরা ভুল করলে বুঝিয়ে বলতে হয়, তরুণেরা ভুল করলে ধৈর্য ধরতে হয়। স্নেহের এই নীরবতা একসময় এমন জায়গায় পৌঁছাল, যেখানে কেউ আর বুঝতে পারল না কোনটি স্বাধীনতা, আর কোনটি সীমালঙ্ঘন। একদিন নগরীর সবচেয়ে বৃদ্ধ শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের বললেন, আমাদের শহরের আয়নাগুলো ভেঙে গেছে।
ছাত্ররা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, আয়না তো প্রতিটি বাড়িতেই আছে। সেগুলো আবার ভাঙল কীভাবে?
বৃদ্ধ শিক্ষক উত্তর দিলেন, যে আয়নায় মানুষ নিজের মুখ দেখতে পায়, সেটি অক্ষত আছে। কিন্তু যে আয়নায় নিজের আচরণ দেখতে পায়, সেটিই ভেঙে গেছে।
গল্পটি কল্পিত। কিন্তু এর মধ্যে আমাদের সমাজের পরিচিত কোন বাস্তবতা খুঁজে পেলে সেটিকে নিছক কল্পকাহিনি বলে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
আমাদের সময়ের শিষ্টাচার, আজকের সময়ের প্রশ্ন: নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত আমাদের বেড়ে ওঠার সময়ে পরিবার, বিদ্যালয় ও সামাজিক পরিবেশে বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেত। বাবা-মা, চাচা-চাচি, মামা-মামী, বড় ভাইবোন কিংবা আত্মীয়স্বজন বয়সে বড় কারও সামনে কথা বলার ক্ষেত্রে একটি সংযম বজায় রাখার প্রত্যাশা ছিল। অপ্রয়োজনীয় তর্ক, অপমানজনক শব্দ কিংবা তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ আচরণকে সাধারণত বেয়াদবি হিসেবেই দেখা হতো। সময়ের সঙ্গে সমাজ বদলেছে, মানুষের জীবনযাপন বদলেছে, বদলেছে ভাষা ও যোগাযোগের ধরনও। তরুণেরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করে। এই পরিবর্তনের ইতিবাচক দিক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রশ্ন তোলার অধিকার, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটি সুস্থ সমাজের অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু স্বাধীনভাবে কথা বলা আর অন্যকে অপমান করে কথা বলা এক বিষয় নয়। রসিকতা আর বিদ্রূপের মধ্যে পার্থক্য আছে। আত্মবিশ্বাস আর ঔদ্ধত্যের মধ্যেও রয়েছে স্পষ্ট সীমারেখা। দুঃখজনকভাবে, কখনো কখনো সেই সীমারেখাটিই যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক আড্ডায়, সামাজিক অনুষ্ঠানে কিংবা পরিচিতজনদের কথোপকথনে এমন কিছু আচরণ চোখে পড়ে, যেখানে বড়দের সঙ্গে অসম্মানজনক ভঙ্গিতে কথা বলাকে কেউ কেউ আধুনিকতা কিংবা স্মার্টনেসের পরিচয় বলে মনে করে। কথার আঘাতটি যত তীক্ষ্ণ, হাসির শব্দটিও যেন তত জোরালো। অথচ একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: কাউকে ছোট করে নিজেকে বড় প্রমাণ করার মধ্যে প্রকৃত বড়ত্ব কোথায়?
নীরবতা কি সম্মতি? আমাদের প্রজন্মের অনেকেই ছোটদের সঙ্গে কথা বলার সময় সচেতনভাবে কোমল ভাষা ব্যবহার করি। আমরা চাই না, আমাদের কঠোর কথায় তারা অপমানিত হোক। চাই, তারা আমাদের কাছ থেকে সম্মান দিয়ে কথা বলা শিখুক। কারণ শিক্ষা কেবল উপদেশে নয়, আচরণের মধ্য দিয়েও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই সদিচ্ছারও একটি সীমা আছে। কেউ বারবার অসম্মানজনক আচরণ করলে বয়সে বড় মানুষটি হয়তো তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেন না। কখনো স্নেহের কারণে, কখনো পারিবারিক সম্পর্কের কথা ভেবে, কখনো নিজের শিক্ষা ও রুচির কারণে তিনি নীরব থাকেন। এই নীরবতাকে দুর্বলতা ভেবে নেওয়া বড় ভুল। একজন মানুষ অপমান বুঝতে পারেন, কষ্টও পান; কিন্তু প্রতিটি কষ্টের জবাবে কষ্ট ফিরিয়ে দিতে চান না। তাঁর সংযমের পেছনে থাকতে পারে দীর্ঘদিনের শিক্ষা, সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা কিংবা ছোটদের প্রতি মমতা। তিনি চুপ আছেন বলে যে তাঁর আত্মসম্মান নেই, তা নয়। অনেক সময় তিনি চুপ থাকেন বলেই সম্পর্কটি ভেঙে যায় না। কিন্তু নীরবতারও একটি বিপদ আছে। ভুল আচরণকে বারবার উপেক্ষা করা হলে কেউ কেউ সেটিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারে। স্নেহ তখন সংশোধনের পথ না দেখিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রশ্রয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং বড়দের দায়িত্ব শুধু সহ্য করা নয়, প্রয়োজন হলে সংযতভাবে ভুলটি ধরিয়ে দেওয়াও। আর ছোটদের দায়িত্ব হলো, সেই সংশোধনকে অপমান মনে না করে আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা।
সম্মান কি একমুখী রাস্তা? এখানে আমাদের বড়দেরও নিজেদের দিকে তাকানো প্রয়োজন। শুধু বয়স বেশি হলেই কেউ সম্মানের অধিকারী হয়ে ওঠেন না; সম্মান অর্জিত হয় আচরণ, ন্যায়বোধ ও মানবিকতার মাধ্যমে। বড়দেরও ছোটদের মতামত শুনতে হবে, তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে মর্যাদা দিতে হবে, অকারণে অপমান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। কোন তরুণ যদি অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, প্রশ্ন তোলে কিংবা যুক্তির মাধ্যমে দ্বিমত প্রকাশ করে, তাকে বেয়াদবি বলা যাবে না। বরং যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, সে সমাজ একসময় চিন্তার স্বাধীনতাও হারায়। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ। সত্য কথা বলার জন্য কাউকে অপমান করতে হয় না। যুক্তির শক্তি প্রদর্শনের জন্য কণ্ঠে তাচ্ছিল্য মেশাতে হয় না। বয়সে বড় কারও সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়, তাঁর ভুলও ধরিয়ে দেওয়া যায় তবুও ভাষায় সৌজন্য বজায় রাখা সম্ভব। সম্মান কোন একমুখী রাস্তা নয়, যেখানে ছোটরা শুধু বড়দের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এটি পারস্পরিক দায়িত্বের একটি সেতু। বড়রা সেই সেতু নির্মাণ করবেন অভিজ্ঞতা, ন্যায়বোধ ও স্নেহ দিয়ে; ছোটরা সেটিকে মজবুত করবে সৌজন্য, সংযম ও বিবেচনাবোধ দিয়ে।
আয়নাটি কার হাতে? সম্মানপুরের গল্পে ফিরে যাই। একদিন বৃদ্ধ শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের হাতে একটি করে আয়না তুলে দিলেন। বললেন, এই আয়নায় তোমরা অন্যের মুখ দেখবে না। দেখবে নিজের আচরণ। এক তরুণ আয়নায় তাকিয়ে বলল, আমি তো কাউকে গালি দিইনি। শুধু একটু মজা করেছি।
শিক্ষক বললেন, তোমার কাছে যা মজা, অন্যের কাছে তা অপমান হতে পারে। মজার আনন্দ তখনই পূর্ণ হয়, যখন তাতে কাউকে ছোট হতে হয় না।
আরেক তরুণ বলল, কিন্তু বড়রাও তো ভুল করেন!
শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন, অবশ্যই করেন। তাই আয়নাটি শুধু তোমাদের হাতে নয়, আমার হাতেও আছে।
এই কথার মধ্যেই হয়তো আমাদের সামাজিক সংকটের একটি উত্তর লুকিয়ে আছে। আত্মসমালোচনা যদি কেবল এক প্রজন্মের দায়িত্ব হয়, তবে সমাজের পরিবর্তন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বড়দের অহংকার যেমন সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে, ছোটদের ঔদ্ধত্যও তেমনি পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করে দিতে পারে। আমরা প্রায়ই বলি, আগের দিনের মানুষ বেশি ভদ্র ছিলেন। কিন্তু অতীতের সবকিছুই যে আদর্শ ছিল, তা নয়। অতীত থেকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে শিষ্টাচার, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক মর্যাদার শিক্ষা; আর বর্তমান থেকে নিতে হবে স্বাধীন চিন্তা, সমতা ও প্রশ্ন করার সাহস। দুটিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নয়, পাশাপাশি রেখেই একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
শেষ কথা আজকের তরুণদের প্রতি আমার অনুরোধ আধুনিক হওয়ার প্রতিযোগিতায় নিজের ভাষার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলো না। স্মার্টনেস পোশাকে, কথার গতিতে কিংবা কাউকে মুহূর্তে স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত স্মার্টনেস হলো কখন কী বলতে হয়, কীভাবে বলতে হয় এবং কোন কথা না বলাই ভালো সেই বিবেচনাবোধ অর্জন করা। তোমরা যখন বড়দের সঙ্গে কথা বলো, মনে রেখো, তাঁদেরও অনুভূতি আছে, আত্মসম্মান আছে। তাঁরা তোমাদের বয়সে ছিলেন, জীবনের অনেক পথ পেরিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে দ্বিমত করো, প্রশ্ন করো, ভুল ধরিয়ে দাও কিন্তু মানুষ হিসেবে তাঁদের মর্যাদাটুকু অস্বীকার কর না। আর আমাদের বড়দের প্রতিও একই অনুরোধ ছোটদের ভালোবাসো, তাদের কথা শোনো, ভুল করলে বুঝিয়ে বলো। সম্মান দাবি করার আগে নিজেদের আচরণেও তার উদাহরণ তৈরি করো। শাসনের নামে অপমান নয়, স্নেহের নামে প্রশ্রয়ও নয়। কারণ একটি সমাজের পতন সব সময় বড় কোন বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে ঘটে না। কখনো কখনো তা শুরু হয় ছোট ছোট বাক্যে, অবহেলার হাসিতে, কাউকে তুচ্ছ করার অভ্যাসে এবং ভুল দেখেও কিছু না বলার দীর্ঘ নীরবতায়। আমরা হয়তো সবাইকে বদলাতে পারব না। কিন্তু নিজেদের ভাষা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পরিবর্তনের সূচনা করতে পারি। মনে রাখতে হবে, বয়স মানুষকে বড় করে, কিন্তু আচরণই তাকে শ্রদ্ধার যোগ্য করে তোলে। আর অন্যকে সম্মান দিতে শেখা মানে নিজেকে ছোট করা নয় নিজের মানবিক উচ্চতাকে প্রকাশ করা। যে প্রজন্ম এই সত্যটি বুঝবে, তার হাত ধরেই হয়তো সম্মানপুরের ভাঙা আয়নাগুলো আবার জোড়া লাগবে।
একজন কবি ও লেখক।