সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম
জাতীয় শ্রমিক লীগের ৫৭ বছর: মুক্তিযুদ্ধের গৌরব, শ্রমিকের অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম টেকনাফে ইভটিজিংয়ের দায়ে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ঝিনাইগাতীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৪ মামলায় ১২ হাজার টাকা জরিমানা আমাদের নিখোঁজ শিশুরা: সংখ্যার বাইরে যে প্রশ্নগুলো জরুরি – নিকোলাস বিশ্বাস কক্সবাজারে সিএনজি থেকে ৩ লাখ ইয়াবা সহ গাড়ি জব্দ Rtv জামালপুর জেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেলেন বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জিএম ফাতিউল হাফিজ বাবু। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুস সবুর কে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।    যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি এসআরবি এর হাতে আটক তাহিরপুরে ছাত্রী হয়রানির বিচার দাবিতে সোচ্চার এলাকাবাসী বোরহানউদ্দিনে সাড়াজাগানো মাছ ধরার প্রতিযোগিতা: ৫০ হাজার টাকার প্রথম পুরস্কার জিতলেন আসাদুল

জাতীয় শ্রমিক লীগের ৫৭ বছর: মুক্তিযুদ্ধের গৌরব, শ্রমিকের অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম

ডঃ মোঃ জয়নুল আবেদীন রোজ / ১৬ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

১২ অক্টোবর বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ১৯৬৯ সালের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় শ্রমিক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। আজ সংগঠনটির ৫৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ের এই পথচলা শুধু শ্রমিকের মজুরি ও কর্মপরিবেশের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়; বাঙালির স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

 

পাকিস্তানি শাসনামলে পূর্ব বাংলার শ্রমজীবী মানুষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার ছিলেন। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, শ্রমিকের মুক্তি এবং জাতির মুক্তি বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। তাই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের আবহে শ্রমিকদের সংগঠিত করার উদ্যোগ হয়ে ওঠে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারখানা, বন্দর, পরিবহন ও অন্যান্য খাতের শ্রমিকরা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন।

 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও শ্রমিকসমাজের অবদান অনস্বীকার্য। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আহ্বানে অসংখ্য শ্রমিক সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন; অন্যরা যোগাযোগ, পরিবহন, রসদ ও আশ্রয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেন। জাতীয় শ্রমিক লীগের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের অংশগ্রহণও সেই বৃহত্তর প্রতিরোধের ইতিহাসের অংশ। তাঁদের আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত অর্জন।

 

কিন্তু ৫৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে এক কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কথিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হয়। যদিও পরবর্তীতে ডঃ ইউনুস নিজেই বলেছেন মেটিক্যুলাস ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের ২০১৮ সাল থেকে কাজ করে অবশেষে ২৪ সালের আগস্ট মাসে সফল হয়েছে। এমনকি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাইডেন সরকার কর্তৃক ২৯ মিলিয়ন ডলার প্রদানের উল্লেখ করেন। ইউনুস এর উপদেষ্টা ৭.২ বুলেট নিয়ে কথা বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হারান। যে বুলেট বাংলাদেশে নিষিদ্ধ সেই বুলেট ব্যবহার করা হয়েছে ২৪ সালের আন্দোলনে। ধারনা করা হয় আমেরিকার তৎকালীন সরকার আর্মস দিয়ে আন্দোলনকারীদের সহযোগিতা করে।

 

২০২৫ সালের ১২ মে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে যা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন। ফলে জাতীয় শ্রমিক লীগও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় বিধিনিষেধের মুখে পড়ে। ২০২৬ সালে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।

 

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী এবং বিভিন্ন সময়ে বিপুল জনসমর্থন পাওয়া একটি রাজনৈতিক শক্তি। দলটির অতীত শাসন নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা থাকতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সব সমর্থককে একই দায়ে অভিযুক্ত করা ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরাধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ যাচাই করা এবং নিরপরাধ মানুষের অধিকার রক্ষা করা।

 

এ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা, সাংবিধানিক ভিত্তি ও আনুপাতিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার অবশ্যই প্রয়োজন। তবে ব্যক্তির অপরাধের দায় নির্ধারণ এবং একটি বৃহৎ রাজনৈতিক ধারার সব সমর্থকের মতপ্রকাশ ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার সংকুচিত করা এক বিষয় নয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও নির্বিচার গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। গণতন্ত্রে বিরোধী মতের অধিকার রক্ষা কোনো সরকারের অনুগ্রহ নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

 

সাম্প্রতিক ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৬ সালের অক্টোবরে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘিরে ব্যাপক গ্রেপ্তারের সমালোচনা করেছে। বিশেষ করে শুধু সমাবেশে যোগ দেওয়া বা রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে আটক হওয়ার ঘটনা মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন যদি নাগরিক অধিকারের পরিসর সংকুচিত করে, তবে গণতন্ত্রের প্রত্যাশা পূরণ হয় না।

 

এই পরিস্থিতিতে জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর কুতুব আলম মান্নান এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখিত খান সিরাজুল ইসলামের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। সংগঠনের নেতাকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি ও নির্যাতনের আশঙ্কা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁরা শ্রমিকের দাবি ও সাংগঠনিক অধিকারের প্রশ্ন তুলে ধরছেন। তাঁদের নেতৃত্বের প্রকৃত সার্থকতা হবে শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত পথে শ্রমিকদের ঐক্য, অধিকার ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

 

একই সঙ্গে আজকের জাতীয় শ্রমিক লীগের সামনে আত্মসমালোচনারও সুযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান অঙ্গীকার। শ্রমিকদের স্বার্থকে কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের স্বার্থের অধীন করা যাবে না।

 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দমননীতি কখনো স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান আনতে পারে না। ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি বহুমতের সহাবস্থান, আইনের সমান প্রয়োগ এবং সাংবিধানিক অধিকার। জাতীয় শ্রমিক লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হবে এমন বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে ভিন্নমত অপরাধ নয় এবং প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষ মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর