দলীয় পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ এবং মব সংস্কৃতির নির্মম পরিণতি
আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি পরিচিত ও পুনরাবৃত্ত চিত্র হলো—ক্ষমতা বা দলীয় পরিচয়ের অন্ধ ছায়ায় একশ্রেণির মানুষের বেপরোয়া হয়ে ওঠা। ক্ষমতার সামান্য বলয় বা নেতার সান্নিধ্য পেলেই অনেকে নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেন। অন্যায়, অবিচার কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সময় তারা দল বা শক্তির অহংকার প্রদর্শন করেন। কিন্তু এই অন্ধ অহংকারের শেষ পরিণতি যে কতটা একা ও করুণ, তা যখন তাদের বোধোদয় হয়, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়।
দলের আড়াল ও দায়মুক্তির রাজনীতি
যেকোনো অপরাধ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সময় অপরাধীরা দল বা সংগঠনের পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তারা মনে করে, দলীয় শক্তি তাদের যেকোনো জবাবদিহিতা থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। যখনই সেই অপরাধ জনসমক্ষে প্রকাশ পায়, আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয় কিংবা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তখন তথাকথিত সেই দল বা সংগঠন মুহূর্তের মধ্যে দায়িত্ব এড়াতে তৎপর হয়ে ওঠে। দল থেকে দ্রুত বহিষ্কারাদেশ জারি করা হয় এবং অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে প্রচার করা হয়—”উক্ত ব্যক্তি আমাদের দলের কেউ নয়, এটি তার একান্ত ব্যক্তিগত দায়।” এই নির্মম সত্যটি অপরাধীরা তখন বুঝতে পারেন, যখন তাদের সুসময়ের সঙ্গীরা একে একে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং আইনি খাঁচায় তাদের একাকী লড়তে হয়।
সহজ-সরল মানুষ ও ভিন্নমতের ওপর মব জাস্টিস
এই সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি প্রকাশ পায় যখন দল বা পদের জোর দেখিয়ে সমাজের সহজ-সরল মানুষ কিংবা ভিন্ন মতের অনুসারীদের নিশানা করা হয়। দলবদ্ধভাবে বা ‘মব’ তৈরি করে নিরীহ মানুষের ওপর চড়াও হওয়া, হেনস্তা করা কিংবা অধিকার হরণ করার প্রবণতা আজ সমাজে এক গভীর ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। যারা ভিন্ন মত পোষণ করেন কিংবা ক্ষমতার কাছাকাছি নেই, তাদের ওপর চড়াও হওয়াকে অনেকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম মনে করেন। অথচ এই ধরনের বেআইনি দলবদ্ধ সহিংসতা বা মব জাস্টিস কেবল আইনের দৃষ্টিতেই অপরাধ নয়, এটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের অন্তরায়।
একক দায়ভার ও আইনের শাসন
ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু এর অপব্যবহারের পরিণাম অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বনাশা। সাময়িক উত্তেজনায় বা পদের প্রভাবে যারা অন্যের ওপর অন্যায় করেন, তারা ভুলে যান যে দিনশেষে অপরাধের দায় কোনো দল, গোষ্ঠী বা সংগঠন নেবে না। রাষ্ট্র ও আইন কোনো দলীয় পরিচয়ে অপরাধীকে ছাড় দেয় না। বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার পর অপরাধের সম্পূর্ণ খেসারত এককভাবেই সেই ব্যক্তিকে বহন করতে হয়। দলীয় ব্যানার বা নেতার আশীর্বাদ তখন কোনো কাজেই আসে না।
উত্তরণের উপায়
এই অবক্ষয় থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সামষ্টিক সচেতনতা জরুরি। অন্যায়কারীদের স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে, দলের নাম ভাঙিয়ে কিংবা মব সৃষ্টি করে সাময়িক দাপট দেখানো গেলেও শেষরক্ষা হয় না। রাজনীতি বা সমাজ পরিবর্তনের নামে যারা হিংসা ও নৈরাজ্য ছড়াচ্ছেন, তাদের নিজেদের স্বার্থেই এই পথ থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীলতা এবং দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এই সামাজিক ক্ষত দূর করা সম্ভব নয়। সময় এসেছে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন হওয়ার—দলীয় পরিচয়ে অপরাধের নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার মানসিকতা চিরতরে পরিহার করতে হবে।
সোহেল সরকার
লন্ডন যুক্তরাজ্য
প্রকাশক ও সম্পাদক বাংলা নিউজ মিডিয়া