জনস্বার্থে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে গিয়ে হামলা ও নির্যাতনের শিকার সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সহায়তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে কক্সবাজারের চকরিয়ার সাংবাদিক এম জিয়াবুল হকের চিকিৎসার ঘটনায়। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলায় আহত এই সাংবাদিকের চিকিৎসায় রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)।
দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত এম জিয়াবুল হক বর্তমানে গুরুতর শারীরিক সমস্যায় চিকিৎসাধীন। তিনি দৈনিক সংবাদের চকরিয়া প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) চকরিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি স্থানীয় বিভিন্ন অনিয়ম, জনদুর্ভোগ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে আসছেন।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি চকরিয়ার উত্তর হারবাং এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হন সাংবাদিক জিয়াবুল হক। অভিযোগ রয়েছে, বালু উত্তোলনসংক্রান্ত সংবাদ সংগ্রহের সময় নাজিম উদ্দীনসহ কয়েকজন তার ওপর হামলা চালান। এতে তার হাত ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে। এ সময় তার সঙ্গে থাকা আরও দুই সাংবাদিকও আহত হন বলে জানা গেছে।
হামলার পর কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ইতোমধ্যে পাঁচ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দীর্ঘ চিকিৎসা ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে বর্তমানে স্বাভাবিকভাবে কলম ধরতেও পারছেন না তিনি। ফলে ফেব্রুয়ারি থেকে পেশাগত লেখালেখি থেকেও দূরে রয়েছেন এই সাংবাদিক।
ঘটনার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মামলার আসামিরা অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্তি পাওয়ায় সাংবাদিকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় বহন করা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসার ব্যয় বহনে সহকর্মীদের আর্থিক সহযোগিতায় সম্প্রতি তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর কলাবাগান এলাকার লং লাইফ হাসপাতালে তার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের অর্থোপেডিক ও ট্রমা সার্জন ডা. মাহমুদ হাসানের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে।
এদিকে সাংবাদিক জিয়াবুল হকের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে দোয়া চেয়েছে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি। একই সঙ্গে হামলায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
বিএমএসএফের নেতারা বলেন, সাংবাদিকরা জনস্বার্থে মাঠপর্যায়ে কাজ করেন। অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ কর্মকাণ্ড ও জনদুর্ভোগের তথ্য তুলে ধরতে গিয়ে অনেক সময় তাদের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেই দায়িত্ব পালনকালে কোনো সাংবাদিক আহত হলে তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তার বিষয়টি রাষ্ট্রের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
তারা আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে চিকিৎসা সহায়তার সুযোগ রয়েছে। অথচ জনস্বার্থে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত সাংবাদিকদের চিকিৎসার ব্যয় অনেক সময় সহকর্মী, সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয়। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিএমএসএফ মনে করে, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনকালে আহত সাংবাদিকদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, আর্থিক সহযোগিতা ও পুনর্বাসনের একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সাংবাদিক জিয়াবুল হকের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এগিয়ে আসবে—এমন প্রত্যাশা সংগঠনটির।
সাংবাদিক এম জিয়াবুল হকের ঘটনা তাই শুধু একজন আহত সাংবাদিকের চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা সহায়তা ও পেশাগত সুরক্ষার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তার দ্রুত সুস্থতার পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং আহত সাংবাদিকদের পাশে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সহকর্মীরা।