একের পর এক বিসিএসে ব্যর্থতার পর ৪৭তম বিসিএসে সাফল্য: দিনাজপুরের আল-আমিন ইসলামের অনন্য কৃতিত্ব
মিজানুর রহমান,বিশেষ প্রতিবেদন:
কঠোর পরিশ্রম, অদম্য অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং শৃঙ্খলাবোধের অনন্য সমন্বয়ে সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দিনাজপুর সদর উপজেলার ৭ নং উথরাইল ইউনিয়নের কৃতি সন্তান আল-আমিন ইসলাম। জীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত সংগ্রামময়। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা আল-আমিনকে আর্থিক সংকটের কারণে দশম শ্রেণি থেকেই টিউশনি ও বৃত্তির অর্থে নিজের পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে হয়েছে।
সফলতার পথও তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। ৪৪তম ও ৪৫তম বিসিএসে প্রাথমিক (প্রিলিমিনারি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা এবং ৪৬তম বিসিএসে চূড়ান্ত ফলাফলে সুপারিশ না পাওয়ার হতাশা—সবকিছুই তিনি ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। সেই ব্যর্থতাকেই শক্তিতে পরিণত করে অবশেষে সদ্য প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএস (সাধারণ) পরীক্ষায় পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও দৃঢ় সংকল্পের স্বাক্ষর রেখেছেন।
একের পর এক ব্যর্থতার পর এই সাফল্য শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি তার পরিবার, দিনাজপুর সদর উপজেলা, সমগ্র দিনাজপুর জেলা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের জন্যও গর্বের বিষয়। তার এই অর্জনে পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও এলাকাবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের আবহ।
শিক্ষাজীবনে উজ্জ্বল সাফল্য
আল-আমিন ইসলামের শিক্ষাজীবন শুরু থেকেই ছিল সাফল্যে ভরপুর।
* ২০০৮ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ বৃত্তি অর্জন।
* ২০১৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫।
* ২০১৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫।
পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং (Footwear Engineering) বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক (অনার্স) পর্যায়ে ৩.৫৯ সিজিপিএ এবং স্নাতকোত্তর (থিসিস) পর্যায়ে ৩.৪৬ সিজিপিএ অর্জন করে উভয় ক্ষেত্রেই প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।
মাস্টার্সের গবেষণাকর্মে অসাধারণ সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০২২ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের (NST) National Science and Technology Fellowship অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে তার মেধা, গবেষণামনস্কতা ও অধ্যবসায় আজকের এই অর্জনের ভিত্তি রচনা করেছে।
শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে তার মেধা, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার পরিচয়ই আজকের এই সাফল্যের দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছে।
কর্মজীবনেও সাফল্যের ধারাবাহিকতা
শুধু শিক্ষাজীবন নয়, কর্মজীবনেও আল-আমিন ইসলামের সাফল্যের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
* ২০১৭–২০২৬ সাল পর্যন্ত দেশের অন্যতম শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উদ্ভাস-উন্মেষ শিক্ষা পরিবারে সিনিয়র রসায়ন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
* ২০২১ সালভিত্তিক নিয়োগে সোনালী ব্যাংক পিএলসি-এর অফিসার (ক্যাশ) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।
* ২০২২ সালভিত্তিক নিয়োগে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি (বিডিবিএল)-এর সিনিয়র অফিসার হিসেবে বর্তমানে আশুলিয়া শাখায় কর্মরত রয়েছেন।
* সর্বশেষ ৪৭তম বিসিএসে পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে আবারও প্রমাণ করেছেন—অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও নিরলস পরিশ্রম থাকলে কোনো লক্ষ্যই অসম্ভব নয়।
বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশে তার পরামর্শ
নিজের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতার আলোকে আল-আমিন ইসলাম বলেন—
“বিসিএস শুধু একটি চাকরির পরীক্ষা নয়; এটি ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়ের দীর্ঘ পথচলা। প্রস্তুতির শুরু থেকেই সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। মৌলিক বিষয়গুলো গভীরভাবে আয়ত্ত করার পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে এবং সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে সবসময় আপডেট থাকতে হবে। বিশেষ করে লিখিত পরীক্ষায় তথ্য, পরিসংখ্যান, চার্ট, চিত্র ও প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি ব্যবহার করলে উত্তরের মান অনেক বৃদ্ধি পায়।”
তিনি আরও বলেন—
“অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা না করে প্রতিদিন নিজের উন্নতির দিকে মনোযোগ দিন। ধারাবাহিক পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক মানসিকতাই একজন মানুষকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। আজকের ছোট ছোট প্রচেষ্টাই আগামী দিনের বড় সাফল্যের ভিত্তি। সফলতা শেষ পর্যন্ত তাদেরই ধরা দেয়, যারা কোনো অবস্থাতেই হাল ছাড়ে না।”
তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল নাম
আল-আমিন ইসলামের এই অসাধারণ অর্জনে উথরাইল ইউনিয়নসহ সমগ্র দিনাজপুর জেলায় আনন্দের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের মতে, সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে মেধা, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এমন সাফল্য অর্জন প্রমাণ করে—সঠিক লক্ষ্য, সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি এবং অবিচল প্রচেষ্টা থাকলে কোনো স্বপ্নই অধরা থাকে না।
তার এই সাফল্য নিঃসন্দেহে দেশের হাজারো বিসিএস প্রত্যাশী ও শিক্ষার্থীর জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এবং নতুন প্রজন্মকে দেশসেবার মহান আদর্শে আত্মনিয়োগ করতে উৎসাহিত করবে।