ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতির অমূল্য নিদর্শন সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জাদুঘর প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন সংরক্ষণ করে আসছে।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের কুমার শরৎকুমার রায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ও গবেষক রামপ্রসাদ চন্দ। বরেন্দ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ, গবেষণা ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে তাঁদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে বরেন্দ্র গবেষণা সমিতি।
১৯১০ সালে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ করা হয়। এসব নিদর্শনের মধ্যে ছিল প্রাচীন ভাস্কর্য, শিলালিপি, মুদ্রা ও অন্যান্য প্রত্নবস্তু। সংগৃহীত নিদর্শনগুলো রাজশাহীতেই সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠা পায় বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর।
প্রাথমিক পর্যায়ে সংগৃহীত প্রত্নবস্তু রাজশাহী পাবলিক লাইব্রেরির কয়েকটি কক্ষে সংরক্ষণ করা হতো। পরে জাদুঘরের নিজস্ব ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯১৬ সালে বর্তমান ভবনের জন্য জমি দেওয়া হয় এবং একই বছর ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। জাদুঘর ভবন নির্মাণে শরৎকুমার রায়ের ব্যক্তিগত অর্থায়ন ও উদ্যোগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন সময়ের পাথর ও ধাতব ভাস্কর্য, শিলালিপি, মুদ্রা, পোড়ামাটির নিদর্শন, পাণ্ডুলিপি, টেরাকোটা ও নানা প্রত্নবস্তু। এসব নিদর্শনের মাধ্যমে বাংলার প্রাচীন সভ্যতা, শিল্প, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার নানা দিক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পর বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন প্রত্নস্থানে অনুসন্ধান ও গবেষণার কাজও বিস্তৃত হয়। প্রাচীন স্থাপনা ও প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহের পাশাপাশি এসব নিদর্শনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে গবেষণা করা হয়। ফলে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর ধীরে ধীরে শুধু প্রদর্শনীর স্থান নয়, গবেষণারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
পরবর্তীতে প্রশাসনিক কাঠামোয় বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ১৯৬৪ সাল থেকে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে এটি রাজশাহীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।
নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের শরৎকুমার রায় এবং তাঁর সহযোগীদের উদ্যোগে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘর আজও প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। রাজশাহী ও নাটোরের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর তাই উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে বিবেচিত।