পাঁচ বিসিএসে ধারাবাহিক সাফল্য:শিক্ষা থেকে প্রশাসন, এবার কাস্টমস ক্যাডার —অধ্যাবসায়ের অনন্য দৃষ্টান্ত মোঃ আশিকুর রহমান
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন :
/ ৪৯
বার দেখা হয়েছে
আপডেট :
রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬
শেয়ার করুন
পাঁচ বিসিএসে ধারাবাহিক সাফল্য: শিক্ষা থেকে প্রশাসন, এবার কাস্টমস ক্যাডার—অধ্যবসায়ের অনন্য দৃষ্টান্ত মো. আশিকুর রহমান
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস, পরিকল্পিত প্রস্তুতি এবং ইতিবাচক মানসিকতা—এই চারটি গুণের সমন্বয়ে একের পর এক বিসিএসে সাফল্যের বিরল নজির স্থাপন করেছেন পাবনার কৃতি সন্তান মো. আশিকুর রহমান। টানা পাঁচটি বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে চারবার বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি বিসিএস প্রত্যাশীদের কাছে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল নাম হয়ে উঠেছেন।
১৯৯৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার মাজপাড়া ইউনিয়নের গোকুলনগর গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী। ২০০৬ সালে গোকুলনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন।
পরবর্তীতে শহীদ আব্দুল খালেক উচ্চ বিদ্যালয়, খিদিরপুর থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ২০১২ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। এরপর দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নটরডেম কলেজ, ঢাকা থেকে ২০১৪ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ লাভ করেন।
উচ্চশিক্ষায় তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকে ৩.৮১ এবং ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তরে ৩.৭৫ সিজিপিএ অর্জন করে শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রাখেন।
পেশাজীবনেও তিনি সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০২৪ সালের ২৫ জুন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এ সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন।
বিসিএসে অনন্য ধারাবাহিকতা
মো. আশিকুর রহমানের বিসিএস যাত্রা সত্যিই ব্যতিক্রমী।
৪৪তম বিসিএস: সাধারণ ও কারিগরি (উভয়) ক্যাডারের ভাইভায় অংশ নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত।
৪৫তম বিসিএস: আবারও শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত।
৪৬তম বিসিএস: স্বপ্নের প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত।
৪৭তম বিসিএস: কাস্টমস অ্যান্ড এক্সাইজ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত।
পরবর্তী বিসিএস: প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি।
বিসিএস প্রস্তুতির কৌশল
নিজের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন নিজস্ব নোট তৈরির অভ্যাস এবং বিশ্লেষণধর্মী প্রস্তুতিকে।
তাঁর মতে, বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, বাংলা ও ইংরেজি রচনার জন্য শুধু গাইডবই নয়; গবেষকদের মতামত, পত্রিকার বিশ্লেষণধর্মী কলাম এবং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ ৫০-৬০টি টপিক নির্বাচন করে প্রতিটির জন্য আলাদা নোট তৈরি করা উচিত, যেখানে তথ্য-উপাত্ত, গবেষণা, কারণ, সমাধান ও সুপারিশ সংক্ষেপে থাকবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রযুক্তির যুগে ডিপসিক, জেমিনি কিংবা চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে নিজের নোটকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তবে তথ্য যাচাই করে গ্রহণ করতে হবে।
ইংরেজির ক্ষেত্রে নিয়মিত সম্পাদকীয় ও আন্তর্জাতিক কলাম পড়া, শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা এবং লিখে লিখে অনুশীলনের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। অনুবাদের জন্য আলাদা নিয়ম মুখস্থ না করে পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্ন এবং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সহজ ভাষায় অনুশীলন করাকেই তিনি যথেষ্ট মনে করেন।
বাংলা, বিজ্ঞান, গণিত ও মানসিক দক্ষতা অংশেও লিখিত অনুশীলনকে তিনি সবচেয়ে কার্যকর প্রস্তুতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, “পড়ার চেয়ে লিখে অনুশীলন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
ভাইভায় আত্মবিশ্বাসই মূল শক্তি
ভাইভা বোর্ড নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও ব্যতিক্রমী।
তিনি মনে করেন, ভাইভা বোর্ডকে পরীক্ষার চাপ হিসেবে নয়, বরং কয়েকজন বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মানুষের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক কথোপকথন হিসেবে ভাবা উচিত। প্রশ্নের উত্তরে অপ্রয়োজনীয় কিছু না বলে সংক্ষেপে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এবং অকপটে উত্তর দেওয়াই সফলতার চাবিকাঠি।
তিনি বলেন, কখনো কৃত্রিম আচরণ বা সাজানো উত্তর দেওয়া উচিত নয়। নিজের শক্তির পাশাপাশি দুর্বলতার কথাও সততার সঙ্গে উপস্থাপন করতে হবে।
বিসিএস প্রত্যাশীদের প্রতি বার্তা
বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশে মো. আশিকুর রহমান বলেন, মৌলিক ও সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে জানতে হবে। তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং প্রতিদিন খাতায় লিখে লিখে অনুশীলন করতে হবে। পাশাপাশি বেশি বেশি শুনতে, জানতে এবং শেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
তাঁর বিশ্বাস, ইতিবাচক মনোভাব, পরিশ্রম এবং ধারাবাহিক চর্চার কোনো বিকল্প নেই।
জীবনদর্শন
তিনি মনে করেন, জীবনে সফল হতে হলে হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার থেকে দূরে থাকতে হবে। সুযোগ পেলেই নিঃস্বার্থভাবে ভালো কাজ করা উচিত। সর্বোপরি আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস, নিয়মিত ইবাদত, জিকির এবং আন্তরিক দোয়া মানুষকে মানসিক শক্তি ও সঠিক পথের দিশা দেয়।
ব্যক্তিগত পছন্দ
মো. আশিকুর রহমানের প্রিয় ব্যক্তিত্ব মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও ড. জাকির নায়েক। তিনি স্প্যানিশ ফুটবল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ-এর সমর্থক। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর প্রিয় দল স্পেন ও জার্মানি। প্রিয় লেখক শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হান।
পড়াশোনার বাইরেও প্রাণিজগতের প্রতি তাঁর রয়েছে বিশেষ ভালোবাসা। পান্ডা, মারমট (প্রেইরি ডগ) ও কাঠবিড়ালির আচরণ, জীবনযাপন ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে তৈরি ভিডিও ও ডকুমেন্টারি তিনি নিয়মিত উপভোগ করেন।
পরিশ্রম, পরিকল্পনা, আত্মবিশ্বাস, সততা এবং ইতিবাচক জীবনদর্শনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মো. আশিকুর রহমানের সাফল্যের গল্প নিঃসন্দেহে বিসিএসসহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য এক অনুকরণীয় প্রেরণা।