“শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করেছিলাম, আর নিজেকে পরিপূর্ণ বিশ্বাস করেছিলাম”— টানা চার বিসিএসে চারবারই ক্যাডার পাবনার আশিকুর রহমান
মিজানুর রহমান,বিশেষ প্রতিবেদন:
অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস, আল্লাহর ওপর অটুট ভরসা এবং নিরলস পরিশ্রম—এই চারটি শক্তির সমন্বয়েই একের পর এক সাফল্যের গল্প লিখেছেন পাবনার কৃতী সন্তান মো. আশিকুর রহমান। বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েই তিনি গড়েছেন অনন্য নজির। টানা চারটি বিসিএসে অংশ নিয়ে চারবারই ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। ৪৪তম ও ৪৫তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডার, ৪৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডার এবং সর্বশেষ ৪৭তম বিসিএসে কাস্টমস অ্যান্ড এক্সাইজ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বিসিএস প্রত্যাশীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।
১৯৯৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার মাজপাড়া ইউনিয়নের গোকুলনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আশিকুর রহমান। তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা গোকুলনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ২০০৬ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তিনি শহীদ আব্দুল খালেক উচ্চ বিদ্যালয়, খিদিরপুর থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ২০১২ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
এরপর দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নটরডেম কলেজ, ঢাকা থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ২০১৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষায় তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। স্নাতকে ৩.৮১ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৭৫ সিজিপিএ অর্জন করে কৃতিত্বের সঙ্গে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন।
কর্মজীবনের শুরু হয় ২০২৪ সালের ২৫ জুন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এ সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে গিয়ে তিনি একের পর এক সাফল্য অর্জন করেন।
বিসিএসে তাঁর সাফল্যের ধারাবাহিকতা সত্যিই ঈর্ষণীয়। ৪৪তম বিসিএসে অর্থনীতি বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে, ৪৫তম বিসিএসেও শিক্ষা ক্যাডারে, ৪৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে এবং ৪৭তম বিসিএসে কাস্টমস অ্যান্ড এক্সাইজ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এছাড়া পরবর্তী বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হলেও লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি।
নিজের সাফল্যের রহস্য সম্পর্কে আশিকুর রহমান বলেন, “আমি শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করেছিলাম এবং নিজেকে পরিপূর্ণ বিশ্বাস করেছিলাম। কোনো খারাপ ফলাফল আমাকে কখনো ভেঙে দিতে পারেনি। আমি বিশ্বাস করতাম, আল্লাহ নিশ্চয়ই আমার জন্য আরও উত্তম কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছেন। তাই কখনো হতাশ না হয়ে নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী পড়াশোনা করেছি এবং পড়াটাকে সবসময় উপভোগ করার চেষ্টা করেছি।”
বিসিএস প্রস্তুতি সম্পর্কে তাঁর পরামর্শ অত্যন্ত বাস্তবধর্মী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, বাংলা ও ইংরেজি রচনার জন্য গবেষণা, পত্রিকার বিশ্লেষণধর্মী কলাম এবং সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গভীরভাবে পড়তে হবে। প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ টপিক নির্বাচন করে প্রতিটি বিষয়ে তথ্য, গবেষকদের মতামত, পরিসংখ্যান, কারণ, সমস্যা, সমাধান ও সুপারিশসহ সংক্ষিপ্ত নোট তৈরি করতে হবে। সেই নোট নিয়মিত লিখে লিখে অনুশীলন করতে হবে।
তিনি মনে করেন, বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় সফল হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো “প্রচুর লেখা”। শুধু পড়লেই হবে না, বারবার লিখে অনুশীলন করতে হবে।
বিজ্ঞান পড়তে হবে আর লিখতে হবে।বিজ্ঞান পড়ার চেয়ে লিখতে হবে বেশি।বাংলার সাহিত্য অংশের পড়া টা কনসাইজ করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো পড়তে হবে।দুর্বোধ্য প্রশ্নগুলো নিজের মত করে সহজ ভাষায় নোট করে ফেলতে হবে।গ্রন্থ সমালোচনা খুব প্রিসাইজ ও প্রাসঙ্গিক লিখলেই হবে। কাল্পনিক সংলাপ মুখস্থ না করে নিজের ভেতরে থাকা সামান্যতম হলেও সাহিত্য প্রতিভা কাজে লাগিয়ে নিজের মত করে একদম চাক্ষুষ ঘটছে বা ঘটেছে এরকম বাস্তবিকভাবে লিখতে হবে।আশেপাশের পরিবেশ,শব্দ,চরিত্র,আবহাওয়া,মানুষের কথাবার্তা, আচরণ খুব শৈল্পিকভাবে নিজের ভাষায় লিখতে হবে।রচনার মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক বিখ্যাত কোটেশন,প্রয়োজনীয় ডেটা,সরকারি পদক্ষেপ,সুপারিশ,বিভিন্ন গবেষণার ফাইন্ডিংস,কলাম থেকে পাওয়া বিখ্যাত লেখকদের মতামত।
বিশেষ করে বিজ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি, অনুবাদ এবং রচনার ক্ষেত্রে নিয়মিত লেখার বিকল্প নেই। গণিতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো অনুশীলন করলেই যথেষ্ট এবং মানসিক দক্ষতার জন্য আগের বছরের প্রশ্নগুলো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত।
ভাইভা বোর্ড সম্পর্কে আশিকুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গিও ব্যতিক্রমী। তাঁর ভাষায়, “আমি ভাইভা বোর্ডকে কখনো ভয় পাইনি। মনে করতাম, কয়েকজন জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ মানুষের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছি। তাই সবসময় স্বাভাবিক, আত্মবিশ্বাসী ও অকপট থাকার চেষ্টা করেছি। যা জানি, সংক্ষেপে সেটাই বলেছি। কখনো কৃত্রিম হওয়ার চেষ্টা করিনি; এমনকি নিজের দুর্বলতার কথাও লুকাইনি।”
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি একজন ইতিবাচক মানসিকতার মানুষ। তাঁর বিশ্বাস, হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার থেকে দূরে থেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং আল্লাহকে সর্বদা স্মরণ করাই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি অবসর সময়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন অভিজ্ঞতা শুনতে ভালোবাসেন। এছাড়া সিনেমা দেখা, ঘুড়ি ওড়ানো, সবুজ প্রকৃতিতে হাঁটা এবং পান্ডা, মারমট (প্রেইরি ডগ) ও কাঠবিড়ালির আচরণ নিয়ে নির্মিত ভিডিও ও ডকুমেন্টারি দেখা তাঁর প্রিয় শখ।
প্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও ড. জাকির নায়েকের নাম উল্লেখ করেন। প্রিয় লেখক জহির রায়হান, প্রিয় অভিনেতা উত্তম কুমার। ফুটবলে তাঁর প্রিয় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্পেন ও জার্মানির সমর্থক।
বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশে আশিকুর রহমানের শেষ বার্তা, “মৌলিক কিন্তু সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সব দৃষ্টিকোণ থেকে জানতে হবে। প্রচুর শুনতে হবে, প্রচুর লিখতে হবে এবং সবসময় ইতিবাচক থাকতে হবে। বাসায় বসে খাতায় লিখে লিখে অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই। পড়াশোনাকে উপভোগ করুন, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। সফলতা অবশ্যই ধরা দেবে।”
টানা চারটি বিসিএসে চারবার ক্যাডার হওয়ার এই অনন্য অর্জন শুধু আশিকুর রহমানের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি পাবনা জেলার জন্যও গর্বের এক উজ্জ্বল অধ্যায় এবং হাজারো বিসিএস প্রত্যাশীর জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প।