মোঃ সুজন আহাম্মেদ সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারঃ
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় মাসুদ রানার একটি ছোট চায়ের দোকানের সামান্য আয় দিয়ে চলে চার সদস্যের সংসার। দিন শেষে আয় মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। সেই সীমিত আয়ের মধ্যেও বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করা। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কঠোর পরিশ্রম করে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের মোসা. মাহমুদা খাতুন।
মেধা, অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে মাহমুদা সম্প্রতি জামালপুর সরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তবে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের পথে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থসংকট।
মাহমুদার বাবা মাসুদ রানা কৃষ্ণপুর গ্রামে একটি ছোট চায়ের দোকান পরিচালনা করেন। মা সায়েরা বিবি গৃহিণী। দুই শতক জমির ওপর নির্মিত একটি কাঁচা ঘরই তাদের একমাত্র সম্বল। আবাদি জমি বা বাড়তি কোনো আয়ের উৎস নেই। তারপরও মেয়ের পড়াশোনার আগ্রহ দেখে নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে তাকে এগিয়ে নিয়েছেন তারা।
অভাব কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি মাহমুদার স্বপ্নকে। নিয়মিত কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ না থাকলেও বই ধার করে, নিজের প্রচেষ্টায় চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। এর ফল হিসেবে ২০২৩ সালে কৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে কৃষ্ণপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি।
মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর পরিবারে আনন্দের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে নতুন দুশ্চিন্তা। ভর্তি ফি, বই, হোস্টেল ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে পরিবারটির জন্য।
মাহমুদার বাবা মাসুদ রানা জানান, মেয়ের ভর্তি ফি বাবদ প্রায় ১৩ হাজার টাকা ধার করে সংগ্রহ করতে হয়েছে। প্রথম বর্ষের বই কিনতে প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং অ্যানাটমি শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় স্কেলেটন কিনতে প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাগবে। এছাড়া হোস্টেল, খাবার ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা প্রয়োজন, যা তাদের পক্ষে বহন করা অনেক কষ্টকর।
মাহমুদা বলেন, মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়ে আমি অনেক খুশি। কিন্তু প্রয়োজনীয় বই এখনো কিনতে পারিনি। বাবার সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে সব খরচ। আমি সবার সহযোগিতা চাই, যেন আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি।
মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মা সায়েরা বিবি। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়ের স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া। সে যেন পড়াশোনা শেষ করে মানুষের সেবা করতে পারে, এটাই আমাদের আশা।
মাহমুদার সংগ্রামের খবর ছড়িয়ে পড়লে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী, জিয়া ফাউন্ডেশনের আজীবন সদস্য ও গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট সুলতানুল ইসলাম তারেক। তিনি মাহমুদার পরিবারের হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
অ্যাডভোকেট সুলতানুল ইসলাম তারেক বলেন, মাহমুদা শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো তানোরের গর্ব। তার মতো মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়, সে জন্য আমি সহযোগিতা অব্যাহত রাখব।
স্থানীয়রা জানান, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও মাহমুদার এই অর্জন এলাকার জন্য অনুপ্রেরণার। সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষ এগিয়ে এলে তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন আরও সহজ হবে।
মাহমুদার গল্প শুধু একটি পরিবারের সংগ্রামের গল্প নয়, এটি প্রমাণ করে ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে প্রতিকূলতাকেও জয় করা যায়। এখন প্রয়োজন সমাজের সম্মিলিত সহযোগিতা, যাতে এই মেধাবী শিক্ষার্থী একদিন সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেন।