নুরুজ্জামান দোয়ারাবাজার সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
সীমান্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসা প্রবল পাহাড়ি ঢল আর গত কয়েকদিনের অবিরাম বর্ষণে সুনামগঞ্জের হাওর জনপদে এখন কেবলই হাহাকার আর কান্নার রোল শোনা যাচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে একের পর এক হাওরে প্রবেশ করছে। চোখের পলকেই কৃষকের সোনালী স্বপ্ন এখন অথৈ পানির নিচে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত হাওরের বুক চিরে যেখানে কয়েকদিন আগেও সোনালী ধানের ঢেউ খেলত সেখানে এখন শুধুই ঘোলা পানির রাজত্ব। বাঁধ ভেঙে আর উপচে পড়া পানিতে সুনামগঞ্জের বোরো চাষিদের মেরুদণ্ড যেন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। প্রকৃতির এই আকস্মিক বৈরী আচরণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক কৃষক পরিবার।
জেলার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা শান্তিগঞ্জ দোয়ারাবাজার ছাতক দিরাই শাল্লা জামালগঞ্জ তাহিরপুর ধর্মপাশা মধ্যনগর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার প্রতিটি হাওরেই এখন হাহাকার বিরাজ করছে। আবহাওয়া প্রতিকূল হওয়ায় এবং হাওরে পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। বাইরের জেলা থেকে আসা শ্রমিকরা এই পরিস্থিতিতে কাজ করতে চাচ্ছেন না। অন্যদিকে হাওরের জমিগুলো কর্দমাক্ত হয়ে পানির নিচে চলে যাওয়ায় ধান কাটার আধুনিক যন্ত্র কম্বাইন হারভেস্টার বা রিপার মেশিনগুলো চালানো একদমই সম্ভব হচ্ছে না। যান্ত্রিক সংকটের কারণে চোখের সামনে ধান তলিয়ে যেতে দেখলেও কৃষকরা কিছুই করতে পারছেন না।
বাঁধের পরিস্থিতি ও পানির তোড় নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন উজানে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ফলে নদ-নদীর পানি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে যা আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি। আমাদের পাউবোর প্রকৌশলী ও কর্মীরা স্থানীয়দের সাথে নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো টিকিয়ে রাখতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। অনেক জায়গায় বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করছে যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার আরও জানান আমরা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি এবং যেখানেই ফাটল বা ধস দেখা দিচ্ছে সেখানেই জিও ব্যাগ ও বাঁশ দিয়ে তা মেরামতের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে পানির উচ্চতা না কমলে বাঁধের ওপর চাপ কমানো দুষ্কর হয়ে পড়বে।
বর্তমান এই ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিয়ে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উমর ফারুক বলেন প্রাকৃতিক এই আকস্মিক বিপর্যয়ে সুনামগঞ্জের কৃষি খাত এক চরম এবং অপূরণীয় সংকটের মুখে পড়েছে। উজানের পাহাড়ি ঢল এতই দ্রুতগতিতে এসেছে যে নিচু এলাকার কৃষকরা ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি নেওয়ার ন্যূনতম সময়টুকুও পাননি। আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ ফসলের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। উপপরিচালক উমর ফারুক আরও বলেন আমরা নিয়মিত প্রতিটি আক্রান্ত হাওর পরিদর্শন করছি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি সঠিক তালিকা প্রণয়ন করার কাজ দ্রুতগতিতে শুরু করেছি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান বলেন আমরা শুরু থেকেই হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলো টিকিয়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানির চাপ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় কিছু জায়গায় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়নি। জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান আরও জানান আমরা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি এবং সরকারি ত্রাণ ও কৃষি সহায়তা দ্রুত বণ্টন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। শ্রমিক সংকট নিরসনে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও বিভিন্ন বাহিনীকে কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে করে অবশিষ্ট ধান দ্রুত ঘরে তোলা সম্ভব হয়।
হাওর তীরের গ্রামগুলোতে এখন বিরাজ করছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কৃষাণীরা ধান শুকানোর শূন্য উঠানে বসে দিগন্তবিস্তৃত হাওরের পানির দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছেন। অনেক কৃষককে দেখা গেছে বুক সমান পানিতে নেমে শেষবারের মতো ডুবে যাওয়া আধাপাকা ধান কাটার এক ব্যর্থ চেষ্টা করতে। সুনামগঞ্জের প্রতিটি উপজেলাতেই ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। যদি বৃষ্টিপাত ও ঢল অব্যাহত থাকে তবে অবশিষ্ট ফসল রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ ও সহজ শর্তে কৃষি ঋণের জোর দাবি জানিয়েছেন দিশেহারা হাওরবাসী। বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরো জেলার অর্থনীতিতেই এক গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে যা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ সার্বক্ষণিক সমন্বয় করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ।