মোঃ সেলিম উদ্দীন
সরকার বাহাদুর সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল ঘোষণা করেছেন। এতে প্রায় ২০ লক্ষ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটেছে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমিও সেই পরিবারেরই অংশ, তাই ব্যক্তিগতভাবে এই সিদ্ধান্ত আমাকে আনন্দিত করে।
কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তিগত আনন্দই শেষ কথা নয়; সেখানে প্রশ্ন ওঠে, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ছে কার ওপর, আর কাদের কাঁধে গিয়ে পড়ছে এর বোঝা?
বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে উনিশ কোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই সরকারি চাকরিজীবী নন। তাঁরা দিন আনে দিন খায়, কেউ কৃষক, কেউ শ্রমিক, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কেউ বেসরকারি চাকরিজীবী। পে স্কেলের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা দেখেছি কীভাবে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। বাজার যেন আগেভাগেই হিসাব কষে রেখেছিল,কার পকেটে টাকা বাড়ছে, আর সেই টাকা কার কাছ থেকে তুলে নেওয়া যাবে।
এটাই আমাদের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ে, কিন্তু বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকে ঢিলেঢালা। ফলে বেতন বৃদ্ধির সুফল পুরোপুরি ভোগ করতে পারেন না কর্মচারীরাও, আর তার খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে, যাঁদের আয় বাড়ে না, কিন্তু ব্যয় বেড়ে যায় দ্বিগুণ গতিতে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল একটি শ্রেণির কল্যাণ নিশ্চিত করা নয়; বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা। ২০ লক্ষ মানুষের বেতন বাড়ানোর চেয়ে ২০ কোটি মানুষের জন্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক বেশি জরুরি ও নৈতিক দায়িত্বের বিষয়। কারণ ক্ষুধার সামনে কোনো পে স্কেল কাজ করে না, আর বাজারের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সব উন্নয়নের গল্প।
সরকার যদি সত্যিই জনবান্ধব হতে চায়, তাহলে পে স্কেল ঘোষণার আগেই শক্তিশালী বাজার তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত ছিল। সিন্ডিকেট ভাঙা, মজুতদারি রোধ, সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার,এসব পদক্ষেপ ছাড়া বেতন বৃদ্ধি কেবল কাগজে-কলমে সুখবর হয়, বাস্তবে তা হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের জন্য দুঃসংবাদ।
আজ প্রশ্নটা তাই স্পষ্ট, রাষ্ট্র কি কেবল বেতনভোগীদের রাষ্ট্র, নাকি ক্ষুধার্ত মানুষেরও রাষ্ট্র? উন্নয়নের মানে কি শুধু আয়ের অঙ্ক বাড়ানো, নাকি জীবনের ব্যয়কে সহনীয় রাখা?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে—আমরা সত্যিই জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারছি কি না, নাকি অল্পের স্বস্তির বিনিময়ে বৃহত্তরের কষ্টকে উপেক্ষা করেই সামনে এগিয়ে যাচ্ছি।