নিজ জেলা বা নিকটবর্তী জেলায় পোস্টিং কি সময়ের দাবি?
একজন সরকারি বা বেসরকারি কর্মজীবীর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মাস শেষে অর্জিত বেতন। কিন্তু সেই উপার্জনের আনন্দ বিষাদে রূপ নেয় যখন অসুস্থ বাবা-মা কিংবা আদরের সন্তানের মুখ দেখার জন্য তাকে কয়েকশ মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়। আমাদের দেশে কর্মস্থলে যোগদানের পর নিজ জেলা বা পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে শত মাইল দূরে অবস্থানের যে ‘সংস্কৃতি’ প্রচলিত আছে, তা বর্তমানে একজন কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য এবং কর্মদক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ধরা যাক একজন কর্মজীবীর কথা, যার বাড়ি উত্তরের জনপদ পঞ্চগড়ে, পরিবার থাকে রংপুরে আর কর্মস্থল জামালপুরে। আপাতদৃষ্টিতে দূরত্ব খুব বেশি মনে না হলেও যাতায়াত ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রটা ভয়াবহ। বাড়ি ফিরতে যদি নৌকা, সিএনজি এবং বাস—এই তিনটি ভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করতে হয়, তবে সেই যাত্রা কেবল শারীরিক ক্লান্তি নয়, চরম অনিশ্চয়তার নামান্তর।
নদী পারাপারের সময় সামান্য দেরি হলে নৌকার শিডিউল মিস করা এবং পরবর্তীতে চার-পাঁচ গুণ বাড়তি ভাড়া গুনে গন্তব্যে পৌঁছানো শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং একজন মানুষের মানসিক শক্তিকে নিংড়ে নেয়।
বৃহস্পতিবার এলেই যেখানে স্বজনদের কাছে ফেরার আনন্দ হওয়ার কথা, সেখানে দীর্ঘ ৬-৭ ঘণ্টার ধকল আর যাতায়াত বিড়ম্বনার কথা ভেবে অনেকেরই দীর্ঘশ্বাস পড়ে।
সপ্তাহ বা মাস শেষে পরিবারকে মাত্র দু-একদিনের জন্য দেখার সুযোগ পাওয়াটাও অনেক সময় দুষ্কর হয়ে পড়ে। মাসে দুই দিন স্টেশন লিভ বা ছুটির বিধান থাকলেও যাতায়াতের ঝক্কি আর সময়ের অভাবে অনেকেই বাড়ি যাওয়ার সাহস পান না। এর ফলে তৈরি হয় পারিবারিক দূরত্ব:
আমাদের প্রত্যাশা: মানবিক পোস্টিং নীতিমালা-
সরকারি বা বেসরকারি—সব ধরণের প্রতিষ্ঠানেই কর্মীদের নিজ জেলা বা অন্তত পার্শ্ববর্তী জেলায় পদায়নের বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন। যদি একজন কর্মী তার পরিবারের কাছাকাছি থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তবে তার যাতায়াতের বাড়তি সময় এবং অর্থ সাশ্রয় হবে। এতে করে তিনি সতেজ মনে দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন, যা পরোক্ষভাবে প্রতিষ্ঠানেরই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে।
মানুষ রোবট নয়। তারও আবেগের জায়গা আছে, শিকড়ের টান আছে। আধুনিক বিশ্বে ‘Work-Life Balance’ বা কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশেও যদি পোস্টিং বা বদলি নীতিতে মানবিকতার ছোঁয়া লাগে, তবে কর্মজীবীদের কষ্ট লাঘব হবে এবং কাজের মান বহুগুণ বাড়বে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ—বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
তরিকুল ইসলাম, এরিয়া ম্যানেজার, সোসাইটি ফর সোসাল সার্ভিস (এসএসএস)।