তিন বিসিএসের সংগ্রামের পর স্বপ্নপূরণ: ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত নড়াইলের সঞ্জয় বর্মন
মিজানুর রহমান,বিশেষ প্রতিবেদন:অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস এবং লক্ষ্য অর্জনের অদম্য ইচ্ছাশক্তি—এই চারটি গুণের সমন্বয়ে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার ছোট কালিয়া গ্রামের কৃতী সন্তান সঞ্জয় বর্মন। দীর্ঘ প্রস্তুতি, একের পর এক ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং অদম্য মানসিক শক্তিকে পুঁজি করে অবশেষে তিনি ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার ছোট কালিয়া গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জয় বর্মন ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে তাঁর অসাধারণ ফলাফলের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই ধারাবাহিক সাফল্য তাঁকে উচ্চশিক্ষার পথেও এগিয়ে নিয়ে যায়।
২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে তিনি দেশের অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি শুধু পড়াশোনাতেই নয়, সহশিক্ষা কার্যক্রমেও অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন।
বিশেষ করে দাবা খেলায় তিনি গড়ে তোলেন ঈর্ষণীয় সাফল্যের ইতিহাস। ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালে টানা তিনবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ২০১৯ ও ২০২০ সালে বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনের দাবা দলের নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে ২০১৯ সালে দল রানার্সআপ এবং ২০২০ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে। এছাড়া ২০২০ সালে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দাবা দলের ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংগঠক হিসেবেও ছিল তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। ২০১৯ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় দাবা ক্লাবের ট্রেজারার এবং ২০২০ সালে জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
দাবা খেলায় তাঁর ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বর্তমানে তিনি একজন আন্তর্জাতিক রেটিংপ্রাপ্ত দাবাড়ু। তাঁর ফিদে (FIDE) স্ট্যান্ডার্ড রেটিং ১৯০৩, যা জাতীয় পর্যায়ের দাবা অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
স্নাতক সম্পন্ন করার পর থেকেই তিনি বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন। তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। ৪৫তম বিসিএস ছিল তাঁর প্রথম বিসিএস, যেখানে তিনি ভাইভা পর্যন্ত পৌঁছেও চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হতে পারেননি। এরপর ৪৬তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। কিন্তু এসব ব্যর্থতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং প্রতিটি ব্যর্থতাকে তিনি নতুনভাবে নিজেকে প্রস্তুত করার অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেন।
অবশেষে তাঁর তৃতীয় প্রচেষ্টা ৪৭তম বিসিএসে এনে দেয় বহু প্রতীক্ষিত সাফল্য। তিনি তাঁর স্বপ্নের পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
বর্তমানে সঞ্জয় বর্মন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। চাকরির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে গিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—পরিকল্পিত অধ্যবসায়, সময়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং দৃঢ় মনোবল থাকলে সাফল্য অর্জন সম্ভব।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সঞ্জয় বর্মন বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল বিসিএস পুলিশ কিংবা প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং জনসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা। মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। তিনি সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন, যেন একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দেশের মানুষের সেবা করতে পারেন এবং সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন।
সঞ্জয় বর্মনের এই অর্জন শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার মানুষের জন্যও গর্বের। তাঁর সাফল্যের গল্প ভবিষ্যৎ বিসিএস পরীক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে—ব্যর্থতা কখনো শেষ নয়; বরং অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস থাকলে একদিন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ধরা দিতেই পারে।