স্বপ্ন থেকে পররাষ্ট্র ক্যাডারে ৫ম: আত্মবিশ্বাস, স্বশিক্ষা ও অধ্যবসায়ের অনন্য দৃষ্টান্ত মাসুদুর রহমান
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:অদম্য ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং নিজের ওপর অটুট বিশ্বাস থাকলে কোনো স্বপ্নই অধরা থাকে না। সেই সত্যেরই উজ্জ্বল উদাহরণ টাঙ্গাইল জেলার বাসাইল উপজেলার কৃতি সন্তান মাসুদুর রহমান। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, নিরলস পরিশ্রম এবং সম্পূর্ণ স্বশিক্ষার মাধ্যমে তিনি ৪৭তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে মেধাতালিকায় ৫ম স্থান অর্জন করে অসাধারণ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন।
মাসুদুর রহমানের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার বাসাইল উপজেলার কাউলজানী ইউনিয়নের শূন্যা গ্রামে। তাঁর বাবা আব্দুর রউ এবং মা মৌসুমী। সাধারণ একটি গ্রাম থেকে বেড়ে ওঠা মাসুদুর ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মেধাবী ও স্বপ্নবাজ।
শিক্ষাজীবনের শুরু গ্রামের বিদ্যালয়ে। সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর তিনি বিএএফ শাহীন স্কুল, পাহাড়কাঞ্চনপুর থেকে ২০১০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী সম্পন্ন করেন। পরে সৃষ্টি একাডেমিক স্কুল, টাঙ্গাইল থেকে ২০১৬ সালে এসএসসি এবং আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা থেকে ২০১৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। উচ্চশিক্ষায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-তে এমবিএ অধ্যয়নরত।
মাসুদুর রহমান জানান, অনার্স শেষ করার পর ২০২৩ সালের শেষ দিকে তিনি বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন। শুরু থেকেই তিনি স্বশিক্ষায় বিশ্বাসী ছিলেন। কোনো কোচিংয়ে না গিয়ে নিজেই বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পরিকল্পিতভাবে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর মতে, সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিক অনুশীলন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ থাকলে স্বশিক্ষার মাধ্যমেও বড় সফলতা অর্জন সম্ভব।
এটি তাঁর প্রথম বড় সাফল্য নয়। এর আগে তিনি ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এছাড়া ৪৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডার (অর্থনীতি)-এ প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। তবে তাঁর একমাত্র স্বপ্ন ছিল পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেওয়া।
তিনি বলেন, “যেদিন থেকে বিসিএস নিয়ে ভাবতে শুরু করি, সেদিন থেকেই পররাষ্ট্র ক্যাডার ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। আমি সবসময় কল্পনা করতাম, একদিন জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছি, আর আমার সামনে লেখা থাকবে ‘Bangladesh’। এই স্বপ্নই আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করেছে।”
স্বপ্নের পথে পরিবার, শিক্ষক এবং বন্ধুদের উৎসাহও ছিল তাঁর অন্যতম শক্তি। বন্ধুদের কেউ কেউ মজা করে তাঁর ফোন নম্বর ‘ফরেইন ক্যাডার’ নামে সংরক্ষণ করতেন। কিন্তু সেই মজার মধ্যেও ছিল তাঁর স্বপ্নের প্রতি সবার অগাধ বিশ্বাস।
তিনি জানতেন, পররাষ্ট্র ক্যাডারে সুযোগ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। অল্পসংখ্যক পদে দেশের সেরা মেধাবীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সফল হতে হয়। তবুও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সততা, অধ্যবসায় এবং নিরলস পরিশ্রম চালিয়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই স্বপ্নই বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মাসুদুর রহমান বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আমাকে নিরাশ করেননি। আমার এই অর্জনে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক ও বন্ধু-বান্ধব সবাই খুব আনন্দিত। আমি চাই বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও উজ্জ্বল করতে এবং দেশের স্বার্থে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে। এজন্য আমি সকলের কাছে দোয়া প্রার্থী।”
মাসুদুর রহমানের এই অর্জন শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, টাঙ্গাইল জেলার বাসাইল উপজেলা এবং সমগ্র দেশের শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে—সুস্পষ্ট লক্ষ্য, আত্মবিশ্বাস, স্বশিক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম থাকলে গ্রামবাংলার একজন শিক্ষার্থীও দেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারে।