আমির হোসেন স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় যাদুকাটা নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এতে তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন। হুমকির মুখে পড়েছে পর্যটনকেন্দ্র শিমুল বাগান, নির্মাণাধীন সেতুসহ নদীর দুই পাড়ের অন্তত ২০-২৫টি গ্রাম। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগান ও আশপাশের জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে যাদুকাটা নদীর বিভিন্ন স্থানে নদীর পাড় কেটে ড্রেজার ও সেইভ মেশিনের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে আসছে। বিশেষ করে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলে বালু উত্তোলনের কার্যক্রম। এতে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা শিমুল বাগানটি প্রতি বছর বসন্তকালে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। কিন্তু নদীর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলনের কারণে বাগানটির অস্তিত্ব নিয়েও এখন শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, গড়কাটি থেকে ঝালরটেক হয়ে ঘাগটিয়া এলাকা পর্যন্ত নদীর পাড়ের বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলনের জন্য গভীর গর্ত ও কোয়ারি তৈরি করা হয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে নদীর দুই পাড়ের বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ওপর।
শুধু শিমুল বাগান নয়, যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুটিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এরই মধ্যে সেতুর পাঁচটি গার্ডার ভেঙে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর পাড় কেটে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশ ও তীরের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ঘাগটিয়া গ্রামের রানু মেম্বার ও মানিগাঁও গ্রামের হাসানের নাম স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে রানু মেম্বার তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের কারণে ইতোমধ্যে ২০-২৫টি গ্রাম ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক পরিবার বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।
যাদুকাটা নদীর ইজারাদার শাহ রুবেল ও নাসির মিয়া বলেন, তারা শুরু থেকেই নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের বিরোধিতা করে আসছেন। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, শিমুল বাগান, নির্মাণাধীন সেতু এবং নদীর দুই পাড়ের জনপদ রক্ষায় সম্মিলিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে পুলিশ ক্যাম্প ও কোস্টগার্ড নিয়োগের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।
তাহিরপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুক আলম শান্তনু বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং মোবাইল কোর্টও পরিচালিত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ ঘটনায় ৬৬টি মামলা হয়েছে এবং ৭০১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিনি জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে মোবাইল কোর্ট ও টাস্কফোর্সের অভিযান ছাড়া অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিকও যাদুকাটা নদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছেন।
এদিকে শিমুল বাগানের বর্তমান মালিক রাখাব উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে তিল তিল করে বাগানটি গড়ে তুলেছেন। কিন্তু নদীর পাড়ে বালু উত্তোলনের কারণে বাগানটি এখন হুমকির মুখে। প্রশাসনকে বারবার অবহিত করেও বালু উত্তোলন বন্ধ না হওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা রাফিয়া বেগম অভিযোগ করেন, নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের কারণে সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানোরও অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, যাদুকাটা নদীর তীর রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অবৈধভাবে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন বন্ধের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী নজরদারি ও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
তাদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শুধু শিমুল বাগান নয়, যাদুকাটা নদীর দুই পাড়ের বহু বসতি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভবিষ্যতে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।