লেখক মোঃ সেলিম উদ্দীন
ঢাকা শহরের বাজারটাকে এখন আর বাজার বলা হয় না। এটা একটা অর্থনৈতিক পরীক্ষা কেন্দ্র। যেখানে ঢুকলেই বোঝা যায় আপনি নাগরিক, না কি দর্শক।
আব্দুল কাদের সাহেব ঢুকলেন বাজারে। বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই, আয় তার চেয়ে অনেক কম। হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ, সরকারি বক্তৃতার মতোই বারবার ব্যবহৃত, কিন্তু কার্যকারিতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
প্রথম দোকানে চাল।
দোকানদার গম্ভীর মুখে বলল,
— “কোন চাল?”
এই প্রশ্নটা এখন আর সাধারণ প্রশ্ন না। এটা একটা ক্লাস-আইডেন্টিটি ফর্ম।
— “সস্তা যেটা,” কাদের সাহেব বললেন।
দোকানদার হেসে ফেলল।
— “সস্তা তো ভাই, স্মৃতি। চালের মধ্যে আর নাই।”
শেষে যে চালটা দেখাল, সেটা দেখে কাদের সাহেবের মনে হলো, এটা হয়তো কোনো একসময় ধানের সাথে পরিচিত ছিল, কিন্তু এখন শুধু সরকারের সাথে মানিয়ে নিয়েছে।
দাম শুনে তিনি বললেন,
— “আধা কেজি দেন।”
দোকানদার অবাক।
— “আধা?”
— “জি। পুরোটা নিলে সরকার মনে করবে আমি ভালো আছি।”
এরপর তেল।
এক লিটার বোতল দেখে মনে হয় রাষ্ট্রীয় ঋণ।
২৫০ মিলি বোতল দেখে মনে হয় ক্ষুদ্রঋণ।
কাদের সাহেব ক্ষুদ্রঋণটাই নিলেন।
— “কম খেলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে—টিভিতে বলছে।”
ডাল কিনতে গিয়ে তার হাত কাঁপল।
মসুর ডাল আজকাল এত দামি যে, এটাকে প্রোটিন না বলে স্বপ্ন বলা উচিত।
তিনি বললেন,
— “ডাল ভিজিয়ে দেন।”
— “ভিজিয়ে?”
— “হ্যাঁ, ভিজিয়ে নিলে মনে হয় বেশি।”
সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা মাছের দোকান।
ইলিশ আছে—দাম শুনলে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ মনে পড়ে।
রুই আছে—মধ্যবিত্তের মতো দেখতে, কিন্তু স্বভাব অভিজাত।
কাদের সাহেব দূর থেকেই তাকালেন।
— “ভাই, আজ মাছ দেখেই পেট ভরাবো।”
সবশেষে গেলেন সবজির দোকানে।
সবজি এখন ‘সিজনাল’ না, পলিটিক্যাল।
যেটার দাম কম, সেটা সরকার সমর্থক; যেটার দাম বেশি, সেটা আমদানিনির্ভর।
কাদের সাহেব দুইটা আলু নিলেন।
দোকানদার জিজ্ঞেস করল,
— “ভাই, আর কিছু?”
— “না। বেশি নিলে ভাববে আমি মজুদদার।”
বাজার শেষ।
মোট খরচ—৩৯২ টাকা।
তার পকেটে আছে—৪০০ টাকা।
বাড়ি ফেরার পথে তিনি ভাবলেন, এই দেশে গরীব হওয়াটাই সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম।
কম খেয়ে থাকা, কম চাওয়া, কম বলা—সবই জাতীয় স্বার্থে।
রাতে ভাতের থালায় তিনি দেখলেন—
ভাত আছে, ডাল আছে, তেলের গন্ধ আছে, মাছের স্মৃতি আছে।
তিনি তৃপ্তির ভান করে বললেন,
— “আলহামদুলিল্লাহ, না খেয়ে তো মরিনি।”
টিভিতে তখন খবর চলছে—
“মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে।”
কাদের সাহেব হাসলেন।
— “ঠিকই তো। এখন আমরা কিনি কম, কিন্তু শুনি বেশি।”
আর সেই হাসিটাই হলো আজকের সবচেয়ে তীব্র ব্যঙ্গ—
কারণ এই দেশে হাসা এখনো ফ্রি,
কিন্তু বাঁচা—দিন দিন দামি বিলাস।