নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিক নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), চট্টগ্রাম। একই সঙ্গে নিহত ও আহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন এবং জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (৩০ আগস্ট) এসব দাবিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয় স্কপ।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, গত ১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ড উপজেলার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ১০ শ্রমিক নিহত এবং ১৪ জন আহত হন। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে সংগঠনটি বলেছে, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে এ ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
স্কপ নেতৃবৃন্দ বলেন, জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE), বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাস শনাক্তকরণ ও পরীক্ষা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যকর পরিদর্শন ও তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।
তারা আরও বলেন, জাহাজ কাটার আগে বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের পরিদর্শন, অনুমোদন ও সনদ প্রদানের প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম, অবহেলা কিংবা দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনতে হবে। তদন্তে কারও দায় প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
স্মারকলিপিতে নয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—দুর্ঘটনার তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক পক্ষের গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা, তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ এবং শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা।
এ ছাড়া নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং আহত শ্রমিকদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় মালিকপক্ষের বহন করার দাবি জানানো হয়।
প্রতিটি শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার আগে বিষাক্ত ও দাহ্য গ্যাস পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা, পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE), অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম, অক্সিজেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
স্কপ নেতৃবৃন্দ জাহাজভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক সুপারিশকৃত ২২ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির গেজেট প্রকাশ ও তা বাস্তবায়নের দাবিও জানান।
পাশাপাশি শ্রম আইন ও নিরাপত্তা বিধিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে সরকারি দপ্তর, মালিক ও শ্রমিক পক্ষের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী নিরাপত্তা তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়।
স্কপ নেতৃবৃন্দ বলেন, “শ্রমিকদের জীবন কোনোভাবেই অবহেলা, অনিয়ম কিংবা মুনাফার কাছে বলি হতে পারে না। জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা ও শ্রমিক মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।”
স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), চট্টগ্রামের যুগ্ম-সমন্বয়ক মো. খোরশেদ আলম ও রবিউল হক শিমুল।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএফটিইউসি সাধারণ সম্পাদক কে. এম. শহিদুল্লাহ, শ্রমিকদল নেতা আবদুল বাতেন, রিজওয়ানুর রহমান খান, বিএলএফ নেতা নুরুল আবছার তৌহিদ, আবু আহমেদ মিঞা, গোলজার বেগম, আল কাদেরী জয়, শাহদাত হোসেন, সোহাগ আহমেদ, মোজাফফর হোসেন প্রমুখ।