রুমা প্রতিনিধি
এ উপলক্ষে বান্দরবানের রুমায় বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন পাড়া বুদ্ধ বিহারে বুদ্ধ পূর্ণিমা যাপন করা হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় রুমা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ৬নং ওয়ার্ডের বৌদ্ধ বিহার সংলগ্নে বোধি বৃক্ষে পবিত্র চন্দন জল ছিটিয়ে উৎসর্গ করা হয়। পরে বুদ্ধ বিহার প্রাঙ্গনে পঞ্চমশীল গ্রহণ করা হয়। এতে শিশু কিশোর ও নর- নারীরা এতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে।
একইভাবে ছাইপো পাড়া বৌদ্ধ বিহার, আমতলী বৌদ্ধ বিহার, পলিকা পাড়া বৌদ্ধ বিহার, মিনঝিরি পাড়া বৌদ্ধ পান্তলা পাড়া বৌদ্ধ বিহার, পাইন্দু ইউনিয়নের মুলপি পাড়া বৌদ্ধ বিহার , চাঁন্দা হেডম্যান পাড়া বৌদ্ধ বিহার, পাইন্দু হেডম্যান পাড়া বৌদ্ধ বিহার , নিয়াংক্ষ্যং পাড়া বৌদ্ধ বিহার ও সেঙ্গুম পাড়া বৌদ্ধ বিহার সংলগ্নে বোধি বৃক্ষে ধর্মীয় ভাব গম্ভীর্যে পূণ্যের আশায় পবিত্র জল ছিটিয়ে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপন উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
এদিকে কেন্দ্রীয় রুমা দেব বুদ্ধ বিহার এর দায়ক দায়িকাদের উদ্যোগে বিশ্ব শান্তি কামনায় বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপন উপলক্ষে বিকেল চারটা এক শুভযাত্রা বের করা হয়। এতে বিহার পরিচালনা কমিটি সহ-সভাপতি সাধন বড়ুয়া ও উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নুম্রাউ মার্মাসহ ধর্মীয় প্রাণ নর নারীরা নেতৃত্ব দেন। দেব বৌদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে রুমা বাজার সহ এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে সমবেত হয়।
পরে শিশু কিশোর নর-নারী ও দায়ক দায়িকাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পঞ্চমশীল গ্রহণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
এতে পঞ্চম শ্রেণীর দীক্ষা দেন দেব বুদ্ধ বিহারে বিহারাধ্যক্ষ উ চাইন্দাসারা ভিক্ষু। লুংঝিরি পাড়া বৌদ্ধ বিহারে বিহারাধ্যক্ষ ও থানা পাড়া বৌদ্ধ বিহারে বিহারাধ্যক্ষ এসময় উপস্থিত ছিলেন।
বৌদ্ধ ভিক্ষুরা জানায়,
*বুদ্ধ পূর্ণিমার তাৎপর্য*
বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই দিনটি পালিত হয়। এর তাৎপর্য তিনটি মহান ঘটনার সাথে জড়িত, তাই একে “ত্রিস্মৃতি বিজড়িত” পূর্ণিমা বলা হয়।
ত্রিস্মৃতি: একই দিনে তিনটি মহান ঘটনা*
গৌতম বুদ্ধের জীবনের তিনটি প্রধান ঘটনা একই পূর্ণিমা তিথিতে ঘটেছিল বলে বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে:
ঘটনা সাল তাৎপর্য
**জন্ম** খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ লুম্বিনী কাননে রাজা শুদ্ধোধন ও রানি মহামায়ার ঘরে সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্ম
**বোধিলাভ** খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৮, ৩৫ বছর বয়সে বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষের নিচে ৬ বছর কঠোর সাধনার পর সিদ্ধার্থ “বুদ্ধ” হন, অর্থাৎ পরম জ্ঞান লাভ করেন
**মহাপরিনির্বাণ** খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৩, ৮০ বছর বয়সে কুশীনগরে তিনি দেহত্যাগ করে নির্বাণ লাভ করেন
একই তিথিতে জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ ও মৃত্যু হওয়ায় দিনটি বৌদ্ধদের কাছে অসাধারণ পবিত্র।
বুদ্ধ পূর্ণিমা’র তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে রুমা অগ্রবংশ অনাথালয়ের নির্বাহী পরিচালক ও আশ্রম পাড়া বৌদ্ধ বিহারে বিহারাধ্যক্ষ উ: নাইন্দিয়া থেরো বলেছেন, মৈত্রী-করুণার বার্তা: এটা বুদ্ধের মূল শিক্ষা – অহিংসা, মৈত্রী, করুণা, সাম্য ও মধ্যপন্থা। বুদ্ধ পূর্ণিমা এই মানবিক মূল্যবোধগুলো স্মরণ ও চর্চার দিন।
চতুরার্য সত্য ও অষ্টাঙ্গিক মার্গ: বোধিলাভের মাধ্যমে বুদ্ধ দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখ নিরোধ ও দুঃখ নিরোধের উপায় – এই চারটি আর্যসত্য আবিষ্কার করেন। মুক্তির পথ হিসেবে অষ্টাঙ্গিক মার্গ দেন। এই দিনে সেই জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
মানবজাতির আত্মশুদ্ধি ও সংযম সম্পর্কে এক প্রশ্নে নাইন্দিয়া ভিক্ষু বলেন- বৌদ্ধরা এ দিন উপোসথ শীল পালন করে, পঞ্চশীল/অষ্টশীল গ্রহণ করে, জীব হত্যা থেকে বিরত থাকে, দান-ধ্যান করে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
সম্প্রীতির উৎসবের দিনে বিহারে বিহারে বুদ্ধপূজা, শীলগ্রহণ, প্রদীপ প্রজ্বালন, ধর্মসভা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে মারমা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, বড়ুয়ারা সম্মিলিতভাবে উৎসব করে। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক।
দান ও সেবা সম্পর্কে রুমা অগ্রবংশ ও মাথালয় *উ নাইন্দিয়া থেরো আরো বলেন*, এ দিনে অসহায়দের অন্নদান, বস্ত্রদান, রোগীর সেবা, কারাগারে খাবার বিতরণ করা হয়। “জীবে দয়া” এই শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ ঘটে।
বিশ্বজনীন বার্তা: জাতিসংঘ ১৯৯৯ সালে বৈশাখী পূর্ণিমাকে “Vesak Day” হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে।
এ অবস্থায় বুদ্ধ পূর্ণিমা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়। এটা জন্ম-জ্ঞান-মৃত্যুর সম্মিলন, মানবতার জয়গান এবং নিজেকে শুদ্ধ করার শপথ নেওয়ার দিন।
শৈহ্লাচিং মার্মা/রুমা প্রতিনিধি
০১ ৫৫ ৩১০ ৪৫৪৬