লড়াই থামেনি, স্বপ্নও হারায়নি—লিখিতে রেকর্ড নাম্বার পেয়েও বারবার ভাইভায় বাদ, অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে আশানুজ্জামানের জয়
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:
বারবার সাফল্যের খুব কাছে গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় অসাধারণ নম্বর অর্জন করেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ভাইভা বোর্ডে থেমে গেছে স্বপ্ন। তবুও হাল ছাড়েননি। অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং কৃষি ও কৃষকের প্রতি গভীর ভালোবাসাকে শক্তি করে শেষ পর্যন্ত নিজের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছেছেন মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার সহগলপুর গ্রামের কৃতি সন্তান আশানুজ্জামান। পরপর চারটি বিসিএসে অংশগ্রহণ এবং চারবার ভাইভা দেওয়ার পর অবশেষে তিনি ৪৫তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
আশানুজ্জামানের পিতা মো. আব্দুল লতিফ এবং মাতা মোছা. সাবিনা ইয়াসমিন।
শিক্ষাজীবনের শুরু গাড়াবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর কুলবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি এবং ২০১৩ সালে মেহেরপুর পৌর কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি সম্পন্ন করেন।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বুটেক্স এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের একাধিক স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু কৃষি ও কৃষকের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ২০১৯ সালে কৃষিতে স্নাতক (অনার্স) এবং ২০২৩ সালে সিড টেকনোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন।
মাস্টার্স অধ্যয়নরত অবস্থাতেই ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ থেকে ৫ অক্টোবর ২০২৩ পর্যন্ত করমিদ শাহ-পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত রূপালী ব্যাংক, মেহেরপুর কর্পোরেট শাখায় অফিসার (জেনারেল) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
পরবর্তীতে ৪১তম বিসিএসের নন-ক্যাডার থেকে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি সিলেটে কর্মরত রয়েছেন।
তবে চাকরি বদলালেও বদলায়নি তাঁর স্বপ্ন। কৃষি ক্যাডারে যোগ দিয়ে দেশের কৃষক ও কৃষির উন্নয়নে কাজ করাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণে তিনি ৪১তম, ৪৩তম, ৪৪তম ও ৪৫তম বিসিএসে অংশগ্রহণ করেন এবং চারবারই ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হন।
তাঁর সংগ্রামের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় ছিল ৪১তম বিসিএস। ওই বিসিএসে কৃষি বিষয়ে লিখিত পরীক্ষায় তিনি ৫৬২ এবং জেনারেল অংশে ৫৩৯ নাম্বার অর্জন করেন। অথচ কৃষি ক্যাডারে সুপারিশের নম্বর এর চেয়েও কম থাকলেও তিনি ভাইভা শেষে চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাননি। সেই হতাশা তাঁকে ভেঙে দিতে পারেনি; বরং আরও দৃঢ় প্রত্যয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটান।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে আশানুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশের কৃষক ও কৃষির উন্নয়নে কাজ করাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। কৃষি ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা হিসেবে আধুনিক, টেকসই ও বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করতে চাই। কর্মজীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কৃষি সেক্টরেই দেশের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই।”
আশানুজ্জামানের এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক, শুভাকাঙ্ক্ষী ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের আমেজ বিরাজ করছে। তাঁর গল্প প্রমাণ করে—বারবার ব্যর্থতা নয়, শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর দৃঢ় সংকল্পই একজন মানুষকে সত্যিকারের বিজয়ী করে তোলে। বিসিএসসহ যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিপ্রার্থীদের জন্য তাঁর এই সাফল্য নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।