কৃষকের ঘর থেকে চার সরকারি চাকরির সাফল্য: মেধা ও অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আবুল কাশেম
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:
প্রতিকূলতা কখনোই সফলতার পথে বাধা হতে পারে না—এ কথারই জীবন্ত উদাহরণ লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ৮ নং কাকিনা ইউনিয়নের মহিষামুড়ী গ্রামের সন্তান মো. আবুল কাশেম। কৃষক পরিবারের সন্তান হয়েও কঠোর পরিশ্রম, মেধা ও অদম্য অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একের পর এক চারটি সরকারি চাকরিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।
১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মহিষামুড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবুল কাশেম। তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু মহিষামুড়ী সুখের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর রুদ্রেশ্বর হাই স্কুল থেকে ২০১৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৫৬ এবং রুদ্রেশ্বর স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০১৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৫৮ অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকেই সফলতার সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করেন আবুল কাশেম। প্রথমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বেসামরিক নিয়োগে কম্পিউটার অপারেটর পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। পরে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)-এর নিরাপত্তা বিভাগে নিয়োগ পেয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মজীবন শুরু করেন।
এরপর ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের পেশকার পদেও সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও সেখানে যোগদান করেননি। সর্বশেষ ২০২৩ সালভিত্তিক সমন্বিত ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষায় অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি-এর অফিসার (ক্যাশ) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি আরও একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন।
নিজের সফলতার পেছনের গল্প তুলে ধরে আবুল কাশেম বলেন, “আমার পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই বড় হয়েছি। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে অনেক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হয়েছে। একসময় অনেকেই মনে করতেন, টাকা ছাড়া সরকারি চাকরি পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করেছি পরিশ্রম, সততা, মেধা ও অধ্যবসায়ের ওপর। মহান আল্লাহর রহমত এবং বাবা-মায়ের দোয়ায় আজ এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমার এই অর্জন যদি গ্রামের কোনো শিক্ষার্থীকে বড় স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন পূরণে কঠোর পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করে, তবে সেটাই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
স্থানীয়দের মতে, আবুল কাশেমের এই অর্জন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য এক অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা। তাঁর জীবনগাথা প্রমাণ করে, সততা, অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও নিরলস পরিশ্রম থাকলে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্য থেকেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
কৃষকের ঘর থেকে উঠে এসে চারটি সরকারি চাকরিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার এই অনন্য কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।