আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে অনিশ্চয়তা, শঙ্কা ও গভীর আস্থার সংকট। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই জনমনে জেগে উঠছে মৌলিক প্রশ্ন—এই নির্বাচন কি সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হবে? ভোটাররা কি নির্বিঘ্নে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন? নির্বাচন যত দ্বার প্রান্তে, ততই জনমনে একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রবলভাবে সামনে চলে আসছে—এই নির্বাচন কি আদৌ অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে, নাকি এটি আবারও একটি পূর্বনির্ধারিত ও প্রশ্নবিদ্ধ আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে? ভোটাররা কি সত্যিকার অর্থে নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে, নাকি ভয়, সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার ভারে সেই অধিকার আবারও সংকুচিত হবে—এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর আজও নেই।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে সহিংসতা ও প্রাণহানির আশঙ্কা যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠছে। প্রশ্ন উঠছে—এই নির্বাচনে আর কোনো লাশ পড়বে না, এই নিশ্চয়তা দেওয়ার দায়িত্ব কে নেবে? অতীত অভিজ্ঞতা মানুষকে আশ্বস্ত করার পরিবর্তে বরং আরও আতঙ্কিত করছে। নির্বাচন ঘিরে রক্তপাতের স্মৃতি এখনো তাজা, আর সেই স্মৃতিই ভোটারদের মনে ভয়ের বীজ বপন করছে। ইতোমধ্যেই একাধিক প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, সক্ষমতা ও ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি ও সামগ্রিক আচরণ ঘিরে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক অশনিসংকেত। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো—ভোটার, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের আস্থা অর্জন করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই আস্থাই আজ সবচেয়ে বড় সংকটে। নির্বাচন কমিশন যদি নিজেকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে না পারে, তবে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সম্প্রতি সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
আদর্শিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি হত্যাকাণ্ড এবং তার এক মাসের ব্যবধানে স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা—এসব ঘটনা নিছক বিচ্ছিন্ন নয়, বরং নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তা শুধু একটি দলের নয়, বরং পুরো সমাজের ক্ষোভেরই প্রতিফলন। অভিযোগপত্র দাখিলের পরও প্রধান অভিযুক্তরা যদি আইনের বাইরে থাকে, তবে আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় দাঁড়ায়—সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আজ রাজধানীর বনশ্রীতে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার লিলির নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং কাওরান বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মো. আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বির হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক ও অস্থির। নির্বাচনের আগে এ ধরনের ঘটনাগুলোর সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে সন্দেহ আরও গভীর হবে, ভয় আরও ছড়াবে, আর ভোটাররা আরও বিমুখ হবে।
রাজনৈতিক সহিংসতা শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট তৈরি করে না, এটি ভোটাধিকারকে সরাসরি বিপন্ন করে তোলে। ভয়ের পরিবেশে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যেতে চায় না—এটাই বাস্তবতা। ফলে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়া কিংবা ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাধা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন যদি কেবল সংখ্যার হিসাব ও আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা গণতন্ত্র নয়—বরং গণতন্ত্রের ব্যর্থতা। নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থার অভাব এই ব্যর্থতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে। কমিশনের উচিত ছিল শুরু থেকেই সকল রাজনৈতিক পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আস্থা তৈরির পরিবর্তে অভিযোগ, সন্দেহ ও অনাস্থাই বাড়ছে।
ঝালকাঠি-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ফয়জুল হককে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার ঘটনাও নিরপেক্ষতা ও সমতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। কমিশনের প্রতিটি সিদ্ধান্তই এখন কেবল প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিচার হচ্ছে—এটাই আস্থাহীনতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জনগণের বিশ্বাস ও ভোটাধিকার। সেই ভোট যদি ভয়, সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ে, তবে নির্বাচন অর্থহীন হয়ে যায়। যদিও বিএনপির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার দলের নেতা কর্মীদের নিয়ন্ত্রেণে রশি টেনে ধরেছেন। তিনি বলেছেন,দেশের নিরেপক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার দল সকল প্রকার সহযোগীতা করবে।
তবে দেশে এখনো নির্বাচন বানচাল করতে একটি পক্ষ নানাবিধ কাজ করছে বলে অভিযোগ করেছেন। এদিকে বিশিষ্ট নাগরিক ও নির্বাচন সংস্কারক ড. বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্য তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—নির্বাচনী অঙ্গন পরিচ্ছন্ন করতে হবে, টাকার খেলা ও ভোট কেনাবেচা বন্ধ করতে হবে, এবং নির্বাচনকে কারসাজিমুক্ত ও স্বচ্ছ করতে হবে। এই দাবি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত। এই দেশের মানুষ ইতিহাসজুড়ে বারবার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে—১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন কিংবা ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন তার উদাহরণ। কিন্তু প্রতিবারই তারা পেয়েছে গুম, খুন, দুর্নীতি ও জবরদখলের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতা। একজন জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিনীত কিন্তু দৃঢ় আহ্বান—এই মানুষগুলোকে আর প্রতারণার চক্রে ফেলবেন না। মানুষ যদি এবারও আশাহত হয়, তবে তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না—এটি রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে আমাদের শাসনব্যবস্থাকে হতে হবে টেকসই, দায়িত্বশীল ও বিশ্বাসযোগ্য। এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষকে বারবার বিপ্লবে নামতে না হয়, রক্ত দিতে না হয়। রাষ্ট্র সবার হতে হলে ব্যক্তিনির্ভর শাসনের বদলে প্রতিষ্ঠাননির্ভর শাসন নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠান গড়া কঠিন, সময়সাপেক্ষ—কিন্তু সেই চেষ্টা থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই। কারণ টেকসই জাতি ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র সম্ভব নয়, আর টেকসই গণতন্ত্র ছাড়া একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
লেখক ও গবেষক
আওরঙ্গজেব কামাল
সভাপতি
ঢাকা প্রেসক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব