বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ। “বগুড়ায় হানিট্যাপ কিশোর গ্যাং সক্রিয় চক্র। সুনামগঞ্জে হোটেল ব্যবসায়ীকে ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদা দাবি: তদন্তে পিবিআইকে আদালতের নির্দেশ ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদের মাসিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত শ্রীমঙ্গলে শাহ মোস্তফা জামেয়া ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘অমর একুশে’ পালিত কাশেমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২: শাস্তির গণ্ডি পেরিয়ে মানবিক পরিবর্তনের এক অনন্য প্রশিক্ষণশালা তাহিরপুরে চুরির অভিযোগে যুবক আটক, পুলিশে সোপর্দ সময় থাকতেই দুর্বল বাঁধ চিহ্নিত করে সংস্কারের আহ্বান; কাশেমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২: শাস্তির গণ্ডি পেরিয়ে মানবিক পরিবর্তনের এক অনন্য প্রশিক্ষণশালা ঝিনাইগাতীতে রমজান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাজার মনিটরিং করেন ইউএনও!

কাশেমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২: শাস্তির গণ্ডি পেরিয়ে মানবিক পরিবর্তনের এক অনন্য প্রশিক্ষণশালা

প্রতিবেদকের নাম / ২৫ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

 

আওরঙ্গজেব কামাল:

কারাগার মানেই শুধুই শাস্তি—এই প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিয়ে গাজীপুরের কাশেমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ আজ রূপ নিয়েছে সংশোধন ও পুনর্বাসনের এক অনন্য দৃষ্টান্তে। এখানে বন্দীদের কেবল আটক রাখা নয়; বরং তাদের মানবিক, নৈতিক ও পেশাগত উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে বহুমাত্রিক কার্যক্রম।

বর্তমান সরকার কারাগারে বন্দীদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের ‘জঞ্জাল’ সরিয়ে বন্দীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা যেন এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে বন্দীদের ইফতার ও সেহরির জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। সংযম, সহনশীলতা ও আত্মশুদ্ধির এই পবিত্র মাসে বন্দীদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে কারা প্রশাসন গ্রহণ করেছে নানা উদ্যোগ।

কারা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এই কারাগারে মোট বন্দীর সংখ্যা ৫ হাজার ১৬৬ জন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৯৪৬ জন রোজা পালন করছেন এবং ২২০ জন রোজা রাখছেন না।

রোজাদার বন্দীদের জন্য প্রতিদিন পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের সমন্বয়ে বিশেষ ইফতার মেনু নির্ধারণ করা হয়েছে। ইফতারে রাখা হচ্ছে—পরিমাণমতো মুড়ি, ছোলা, কলা, ডিম, খেজুর, জিলাপি, গুড়, পেঁয়াজু ও শরবত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্যবিধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই খাবারের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের আগেই খাবার প্রস্তুত ও সুষ্ঠুভাবে বিতরণের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করতে তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসা শাখাকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা দ্রুত সমাধান করা যায়।

কাশেমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর সিনিয়র জেল সুপার আল মামুন জানান, রমজান মাসে বন্দীদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন,
“রমজান সংযম, সহনশীলতা ও আত্মশুদ্ধির মাস। বন্দীদের মানসিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক চর্চার সুযোগ করে দিতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি।”

তিনি আরও জানান, রমজানের প্রথম দিন তিনি নিজেই বন্দীদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নিয়েছিলেন। রমজান উপলক্ষে তারাবির নামাজ আদায়, সেহরি বিতরণ এবং কোরআন তিলাওয়াতসহ অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রম পালনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ধর্মীয় উপকরণ সরবরাহ এবং নামাজের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কারা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বন্দীদের জন্য নিয়মিত ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক আলোচনা ও মানসিক কাউন্সেলিং পরিচালিত হচ্ছে। অনেক বন্দী জানিয়েছেন, এসব কার্যক্রম তাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে এবং জীবনের ভুল সিদ্ধান্তগুলো নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।

নিরক্ষর বন্দীদের জন্য চালু রয়েছে সাক্ষরতা কর্মসূচি। কারাগারের ভেতরেই গড়ে উঠেছে ছোট পরিসরের শিক্ষা কার্যক্রম, যেখানে কেউ শিখছেন অক্ষরজ্ঞান, আবার কেউ সম্পন্ন করছেন প্রাথমিক শিক্ষা। শিক্ষা কার্যক্রম বন্দীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করছে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এর পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ। সেলাই, হস্তশিল্প, কৃষিকাজ, কাঠের কাজ ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বন্দীদের দক্ষ করে তোলা হচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণ কেবল সময় কাটানোর উপায় নয়; বরং মুক্তির পর স্বাবলম্বী জীবনে ফেরার একটি বাস্তবভিত্তিক প্রস্তুতি।

ইতোমধ্যে কয়েকজন সাবেক বন্দী মুক্তির পর ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করে আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়েছেন—এমন তথ্যও জানা গেছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মেলায় বন্দীদের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা হয়েছে এবং তা ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে।

কয়েকজন রোজাদার বন্দী জানিয়েছেন, নিয়মিত ও মানসম্মত ইফতার ব্যবস্থায় তারা সন্তুষ্ট। একজন বন্দী বলেন,
“কারা প্রশাসনের এমন উদ্যোগ আমাদের মাঝে স্বস্তি ও ভালো লাগা তৈরি করেছে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ইবাদত করতে পারছি।”

সরেজমিনে তথ্য জানতে চাইলে কারা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, আধুনিক সংশোধনাগারের মূল লক্ষ্য হলো অপরাধীর মানসিক পরিবর্তন এবং তাকে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। সেই চিন্তা থেকেই এখানে বন্দীদের জন্য মানবিক ও প্রশিক্ষণভিত্তিক পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে অপরাধপ্রবণতা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বন্দীদের ঘৃণা বা অবহেলার চোখে না দেখে তাদের পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের জন্যও জরুরি।

শৃঙ্খলা, শিক্ষা ও কর্মদক্ষতার সমন্বয়ে কাশেমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ আজ যেন শুধুই একটি কারাগার নয়—বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন জীবনের পথে হাঁটার এক আশাবাদী ঠিকানা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর