বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে—“আমরা আর মামুরা” সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি এমন এক মানসিকতার জন্ম দেয়, যেখানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্যই হয়ে ওঠে যোগ্যতার মাপকাঠি; নীতি, মূল্যবোধ, শিষ্টাচার কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা সেখানে গৌণ। পরিবার থেকে শুরু করে প্রশাসন, সমাজ থেকে রাষ্ট্র—সবখানেই আত্মীয়কেন্দ্রিকতা ও স্বজনপ্রীতির এক অদৃশ্য জাল বিস্তার করেছে।
এই প্রবণতা নতুন নয়। উপমহাদেশের রাজনীতি বহুদিন ধরেই পৃষ্ঠপোষকতা-নির্ভর কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু যখন তা নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেয়, তখন তা আর কেবল নৈতিক সমস্যা থাকে না—রাষ্ট্রিক সংকটে রূপ নেয়। সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, “চেইন অব কমান্ড” অকার্যকর হয়ে যায়, আর ভদ্রতার মুখোশের আড়ালে বেড়ে ওঠে এক ধরনের নীরব পৈশাচিকতা।
বিশ্ব ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যখন ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা ও স্বজনপ্রীতি সীমা অতিক্রম করে, তখনই জন্ম নেয় প্রতিরোধ। French Revolution ছিল বৈষম্য ও বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির বিরুদ্ধে জনতার বিস্ফোরণ। একইভাবে Arab Spring স্বৈরশাসন ও ক্ষমতার একচেটিয়াত্বের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিল। ইতিহাসের এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে—ক্ষমতাধরেরা যখন কেবল “নিজেদের মানুষ” নিয়ে রাষ্ট্র চালাতে চান, তখন তার পরিণতি হয় অস্থিরতা ও পতন।
আমাদের সমাজে আজ যে সমস্যাটি প্রকট, তা হলো—সম্মানবোধের সংকট। ব্যক্তি তখনই সম্মান পায়, যখন সে “আমাদের” পরিসরের। অন্যথায় তাকে তুচ্ছ করা, উপেক্ষা করা কিংবা বঞ্চিত করা যেন স্বাভাবিক আচরণ। এতে করে মেধা ও সততা অবমূল্যায়িত হয়; দক্ষতা নয়, পরিচয়ই হয়ে ওঠে অগ্রগতির সিঁড়ি। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রযন্ত্রকে দুর্বল করে, প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে তোলে।
“আমরা আর মামুরা” নীতি ভাঙতে হলে প্রথমেই দরকার মানসিকতার পরিবর্তন। ন্যায়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে। শিক্ষা ও সামাজিক চর্চায় মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা জরুরি। নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আত্মীয়তা নয়, যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায় বড় বড় বক্তব্য, ওয়াজ-নসিহত কিংবা নৈতিকতার বুলি উচ্চারণে সাময়িক করতালি মিললেও বাস্তবের পরিবর্তন আসবে না।
সমাজ তখনই এগোয়, যখন ব্যক্তি তার “আমি” থেকে “আমরা”-তে উত্তীর্ণ হয়—কিন্তু সেই “আমরা” হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, আত্মীয়স্বজন-সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের শক্তি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীতে নয়; তার শক্তি নিহিত ন্যায়বিচার ও সমতার চর্চায়। যদি আমরা সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চাই, তবে “আমরা আর মামুরা” নীতির বেড়াজাল ভেঙে বেরিয়ে আসতেই হবে। নতুবা ইতিহাসের শিক্ষা আবারও আমাদের সামনে কঠোরভাবে ফিরে আসবে।