শেরপুরে কফি চাষে আশার আলো দেখাচ্ছেন উদ্যোক্তা সাজ্জাদ হোসেন তুলিপ!
মিজানুর রহমান,শেরপুর জেলা প্রতিনিধি:শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় কফি চাষে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর মাটি এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে এ অঞ্চলে কফি চাষে সাফল্যের আশা দেখছেন স্থানীয় কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কার্যকর বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে এই সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তিন বছর পর প্রতিটি কফি গাছে ফলন শুরু হয় এবং প্রতি গাছ থেকে গড়ে ৬ থেকে ৭ কেজি কফি পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতি কেজি কফির বাজারমূল্য ৮০ থেকে ১০০ টাকা। প্রতি একর জমিতে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০টি গাছ লাগানো সম্ভব, যার মাধ্যমে বছরে ৩ থেকে ৫ হাজার কেজি কফি উৎপাদন হয়। এতে এক একর জমি থেকে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।
নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ হোসেন তুলিপ কফি চাষে সফলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। চার বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা কফি চাষ এখন তার জন্য বাণিজ্যিক সাফল্য বয়ে এনেছে। বর্তমানে তিনি নিজে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে কফির চারা বিতরণ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন।
জানা যায়, বান্দরবানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সময় পাহাড়ি এলাকায় কফি চাষ দেখে অনুপ্রাণিত হন তুলিপ। পরে ২০২১ সালে চাকরি ছেড়ে নিজ এলাকায় কফি চাষ শুরু করেন। মাত্র পাঁচ কেজি চারা দিয়ে শুরু করা তার উদ্যোগ আজ বিস্তৃত হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তার উৎপাদিত কফি বর্তমানে ময়মনসিংহ, ঢাকা ও কক্সবাজারের বিভিন্ন কফিশপে সরবরাহ করা হচ্ছে।
সাজ্জাদ হোসেন তুলিপ বলেন, স্থানীয়ভাবে কফির উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা সম্ভব। শেরপুরের পাহাড়ি এলাকায় আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রতি একরে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।
কৃষি অফিস জানায়, বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য ‘অ্যারাবিকা’ ও ‘রোবাস্টা’ জাতের কফি চাষ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রোবাস্টা জাতটি বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। মার্চ-এপ্রিল মাসে গাছে ফুল আসে, মে-জুনে ফলের গুটি তৈরি হয় এবং আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফল পরিপক্ব হয়। সংগ্রহের পর রোদে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে কফিবীজ প্রস্তুত করা হয়, যা পরে মেশিনে গুঁড়া করে পানযোগ্য করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “কফি চাষ সফল হলে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখবে। এতে পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকদের আয় বাড়বে এবং জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে।
তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগের উদ্যোগে ইতোমধ্যে শতাধিক আগ্রহী কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি কফির চারা বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
সব মিলিয়ে, শেরপুরের নালিতাবাড়ীর পাহাড়ি এলাকায় কফি চাষ নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা দেশের কৃষি খাতে বৈচিত্র্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।