সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত নদী পাঠলাই এর কামাল পুর যাদুকাটা নদীর ফাজিলপুর স্থানে বিআইডব্লিউটিএর টোল আদায়ের নামে সরকারের নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত দুইগুণ বেশি হারে টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। শুধু অতিরিক্ত টাকা আদায়েই নয়! তাদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে বালু-পাথর, কয়লা ও চুনাপাথর বহনকারী নৌকা আটকে রাখাসহ নৌ- শ্রমিকদের মারধর করে বিএনপি নেতা ইজারাদার নাছিরের লোকজন এমন অভিযোগ নৌ শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের। যার ফলে পাটলাই নদীতে কয়লা ও চুনাপাথর পরিবহনকারী নৌযান থেকে অতিরিক্ত টোল আদায় এবং শ্রমিকদের মারধরের ঘটনায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে । এ দিকে বিআইডব্লিউটি’র ইজারা কর্তৃপক্ষের দাবি সরকারের নির্ধারিত হারেই টোল আদায় করছে তার। জানান, চলতি ২৫-২৬ অর্থ বছরের জন্য প্রায় সাড় ৭ কোটি টাকায় পহেলা জুলাই থেকেই পাঠলাই নদীর বিআইডব্লিউটি’র ইজারা নেন তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাছির মিয়া।
তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা, রক্তি ও পাটলাই নদীতে অতিরিক্ত টোল আদায়, নৌ-শ্রমিকদের হয়রানি ও অবৈধ অর্থ আদায় বন্ধের দাবিতে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে যাদুকাটা নদী নৌকা মালিক সমিতি ও স্টোন ক্রাশার মালিক সমিতি।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দুপুরে দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক এ সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপারের কাছে চার দফা দাবিতে স্মারকলিপি দেন তার।
পাশাপাশি চুনাপাথর ও কয়লা বহনকারী নৌ শ্রমিকরা নদী পথে অতিরিক্ত টোল আদায়ের নামে চাঁদাবাজি বন্ধ না হওয়ায় পর্যন্ত পাঠলাই ও যাদুকাটা নদী দিয়ে কোনরকম নৌযান চলাচল করবে মর্মে গত ১ জুলাই থেকে দুইদিন ধরে অনির্দিষ্টকালের জন্য নৌ ধর্ম ঘটের ডাক দিয়ে প্রায় ৩ শতাধিক চুনাপাথর ও কয়লা বুঝাই নৌকা নিয়ে পাঠলাই নদীর বিআইডব্লিউটি’র টোল আদায় ঘট কামালপুর এলাকায় অবস্থান করছে নৌ শ্রমিকরা।
নৌপথে চলাচলকারী পরিবহন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পাটলাই নদীসহ আশেপাশের পয়েন্টগুলোতে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এবং কোনো সরকারি টোল চার্ট বা বৈধ রশিদ ছাড়া ইচ্ছামাফিক বিআইডব্লিউটি’র নামের অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে ইজারাদার নাছির মিয়া এবং কোটগারি নামে শ্রীপুর গ্রামের ইউপি সদস্য দেলোয়ার হোসেন । এইসব টোল নৈরাজ্যের কারণে সাধারণ শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
শুক্রবার ( ৩ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে পাঠলাই নদীর বিআইডব্লিউটি’র টোলটেক্স ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, গত মাসেই( জুন মাসে) সরকারের নির্ধারিত প্রতি টনে ৩৪ টাকা টোল আদায়ের স্থলে ওই ঘটের নতুন ইজারাদার নাছির মিয়া পহেলা জুলাই থেকেই প্রতি টনে আদায় করছে ৭০ টাকা হারে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী টোল না দেয়ায় ঘটে প্রায় ৩ শতাধিক কয়লা অচেনা অথর্ব যেন নৌকা আটকে আছে। এ সময় সাংবাদিক দেখেই নৌ-শ্রমিকরা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে।
বাজিদপুর গ্রামের মোতাহার নৌকার মাঝি অহিদ মিয়া(৪৫) বলেন, আজ ১৫ দিন ধরে আমার নৌকা আটক। যেই সময় আওয়ামী লীগ আছিল কইছে বিএনপি আইলে উন্নতি অইব, উন্নতি অইব, কিন্তু উন্নতির কোন খবরই নাই। খালি রেইট বাড়ে, রেইট বাড়ে, আমারও তো জান বাঁচতে অইব। কোটি টেহা দিয়া নাও লইয়া শ্রম দিতাছি। হেরারে( টোল আদায়কারী ইজারাদার) চাঁদা দিতে দিতেই কিছু থাহেনা। কামরুজ্জামান কামরুল (সংসদ সদস্য সুনামগঞ্জ-) ভাই ভালা মানুষ উনি ক্ষমতায় আইলে কইছে চাঁদাবাজ থাকত না। এহন দেহি আরও বাড়ছে।
আহমদ শাহ নৌ পরিবহনের মাঝি তাহিরপুর উপজেলা সিকশা গ্রামের তৈবুর রহমান(৩৭) বলেন, আমরা গত মাসেও( জুন মাস) ৩৪ টাকা টোল দিছি। এই মাস(জুলাই) নতুন ইজারা আনছে বিএনপি নেতা নাছির মিয়া। আইন্নাই ৭০ টাকা টোল চাইতাছে। প্রতি টনে ৭০ টানা না দিলে আমরারে যাতে দিতনা। তাই আমরা প্রায় ৩ শ নৌ এইগান আটকা আছি।
সাচনা জামালগঞ্জের মাঝি আবদুল সালাম(৫৪) বলেন, হঠাৎ করে কাইল্কা(গতকাল) হেরা (বিআইডব্লিউটি) কইতাছে ৭০ টাকা দিতে অইব। এইগন( পাঠলাই নদীতে) একটু জাগায় দুই কোটগাড়ির টেহা দিতে হয ৪ হাজার ৫ হাজার কইরা। হেরারে টেহা দিতে দিতেই আমরার কোন্তা থাহেনা। এ-কারণে আমরা চুরি নাই কইরাও মালিকের কাছে চোর সাজদে অয়। আমরা এর একটা ফয়সাল চাই। আমরা(নৌ শ্রমিকরা) আশাবাদী ছিলাম বর্তমান এমপি সাব আইলে দুর্দশা শেষ হইব। প্রতিটা নাইয়াই (মাঝি) নামাজ পড়ে দোয়া করছি ভাই কামরুল এমপি হইলে চাঁদাবাজি কমবো। এহন আরও বেশি হইছে বলে কেঁদে দিলেন ওই শ্রমিক।
যাদুকাটা স্টোন ক্রাশার মালিক সমিতির সভাপতি ও ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, তিনদিনের ব্যবধানে বিআইডব্লিউটি এর টোল দিতে হচ্ছে ৩৪ টাকার স্থলে ৭০ টাকা। এখন একই ইউনিয়নে কোর্টগারির নামে দুই স্থানে প্রতিটি নৌকা দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। পাঠলাই ও যাদুকাটা নদী দিয়ে একটা নৌকা জামালগঞ্জ যেতে যেতে চাঁদা গুনতে হয় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। চাঁদাবাজদের চাঁদা দিতে দিতেই আমাদের কিছুই থাকেনা। এখন মনে হয় আমরা ব্যবসাও ছেড়ে দিতে হবে। নৌকাও বিক্রি করে দিতে হবে।
পাঠলাই নদীর বিআইডব্লিউটি এর ইজারাদার নাছির মিয়া অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সরকারের নির্ধারিত হারিয়ে আমি তুল আদায় করছি। বিআইডব্লিউটি কর্তৃপক্ষ আমাকে প্রতি টানে ৭০ টাকা হারে টোল আদায়ের নির্দেশনা দিয়েছেন আমি তাই আদায় করছি।
বিআইডব্লিউটি’র সিলেট অঞ্চলিক দপ্তর এর উপ পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, পহেলা জুলাই থেকে সরকার টেরিট তফসিলে মালামাল লো ডাউনলোডে পূর্ণ নির্ধারণ করা হইছে ৭০ টাকা হারে। এটি সরকার নির্ধারিত সারা বাংলাদেশের জন্য বিআইডব্লিউটি’র টোল আদায়ের হার। এখানে ইজারাদার কোনরূপ বেশি টাকা বা চাঁদা দিচ্ছেনা।