স্বপ্ন থেকে সাফল্য: এলাম, দেখলাম, জয় করলাম — ৪৭তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে ২য় সাব্বির হোসেন
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:
অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অটল আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন—এই চার শক্তির সমন্বয়ে জীবনের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করেছেন নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার কৃতি সন্তান মো. সাব্বির হোসেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সীমিত সামর্থ্যকে জয় করে তিনি সদ্য ঘোষিত ৪৭তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, শিক্ষা ক্যাডারে সম্মিলিত মেধাক্রমে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে তিনি নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন।
১৯৯৮ সালের ১২ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন সাব্বির হোসেন। তাঁর বাবা আব্দুর রহমান দীর্ঘদিন প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। দেশে ফিরে ক্ষুদ্র খামারি হিসেবে সংসারের হাল ধরলেও বুকভরা স্বপ্ন ছিল সন্তানদের সুশিক্ষিত ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার। মা শাহিনা রহমান একজন গৃহিণী। দুই ভাইয়ের মধ্যে সাব্বির ছোট। তাঁর বড় ভাই রাকিবুল হাসান বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে কর্পোরাল হিসেবে কর্মরত।
ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও অধ্যবসায়ী সাব্বির ২০১৪ সালে সোনাবাজু উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি এবং ২০১৬ সালে রাজশাহী বরেন্দ্র কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে অনার্সে ৩.৩৮ এবং মাস্টার্সে ৩.৬৪ সিজিপিএ অর্জন করে উচ্চশিক্ষার পথ সফলভাবে শেষ করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ২০২৩ সালে সহপাঠী কামরুন নাহারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সাব্বির। এরপর শুরু হয় তাদের জীবনের নতুন এক সংগ্রামের অধ্যায়। সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দুজনই চাকরির প্রস্তুতি ও টিউশনি চালিয়ে যেতে থাকেন। পরিবারের সদস্যদের নিরন্তর উৎসাহ, বিশেষ করে বাবা-মায়ের সাহস ও দোয়া তাদের পথচলাকে আরও শক্তিশালী করে।
মাত্র ছয় মাসের প্রস্তুতিতে তিনি ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু এরপর জীবনে আসে কঠিন সময়। নানা মানসিক চাপ, বারবার ব্যর্থতার হতাশা এবং শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত ৪৬তম বিসিএসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলেও তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং স্ত্রী কামরুন নাহারের অনুপ্রেরণা, নিজের আত্মবিশ্বাস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে নতুন উদ্যমে আবারও প্রস্তুতি শুরু করেন।
অবশেষে সেই নিরলস সাধনার ফল আসে ৪৭তম বিসিএসে। শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পাশাপাশি সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে তিনি নিজেকে দেশের অন্যতম সেরা মেধাবীদের কাতারে স্থান করে নিয়েছেন। আরও আনন্দের বিষয়, তাঁর সহধর্মিণী কামরুন নাহারও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। একই পরিবারের দুই সদস্যের এই সাফল্য সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
সাব্বির হোসেনের এই অর্জন শুধু তাঁর পরিবারের নয়; গুরুদাসপুর উপজেলা এবং সমগ্র নাটোর জেলার মানুষের জন্য গর্বের বিষয়। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় প্রমাণ করে, সীমিত সামর্থ্য কখনোই বড় স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না। সততা, অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতাকেই জয় করা সম্ভব।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে তিনি একজন দক্ষ, সৎ ও দায়িত্বশীল শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। একই সঙ্গে তাঁর সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে, সেই স্বপ্ন পূরণে নিরলস পরিশ্রম করতে এবং কখনো হাল না ছাড়তে অনুপ্রাণিত করবে।