“আমার বিসিএস সাফল্যের নেপথ্যের নায়িকা তুমি” — জন্মদিনে স্ত্রী সামিনাকে এক পুলিশ ক্যাডারের আবেগঘন খোলা চিঠি
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:
সংগ্রাম, ভালোবাসা, অগণিত ত্যাগ আর এক নারীর অদম্য বিশ্বাস—যে গল্পের শেষটা লেখা হলো পুলিশ ক্যাডারে সাফল্যের মধ্য দিয়ে।
আর কিছুদিন পর আমাদের বিবাহিত জীবনের তিন বছর পূর্ণ হবে। এতদিনে তোমাকে নিয়ে তেমন কিছু লেখা হয়নি—মাঝে মাঝে কয়েকটি চিঠি ছাড়া। কিন্তু আজ তোমার জন্মদিন। মনে হলো, তোমাকে নিয়ে মনের কথাগুলো প্রকাশ করার জন্য এর চেয়ে সুন্দর দিন আর হতে পারে না। তাই আজ লিখতে বসেছি।
আমাদের পথচলা শুরু ২০১৮ সালে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রতিটি ধাপে তুমি ছিলে আমার সবচেয়ে বড় সহায়। তোমার ক্লাসনোট, লেকচার, হোমওয়ার্ক—সবকিছুর ওপর ভর করেই কোনো রকমে অনার্স শেষ করেছি। টেনেটুনে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার পেছনেও তোমার অবদান ছিল অপরিসীম।
অনার্সের শেষ বর্ষ থেকেই বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করি। প্রস্তুতি ভালোই চলছিল। কিন্তু ৪৫তম বিসিএস প্রিলিমিনারিতে অপ্রত্যাশিতভাবে ব্যর্থ হলাম। সেই ব্যর্থতা আমাকে ভেঙে দিয়েছিল। পড়াশোনা থেকে একপ্রকার বিরতি নিয়েছিলাম। ঠিক সেই সময়ই আমাদের বিয়ের সিদ্ধান্ত হলো। তখন আমরা দুজনই মাস্টার্সের শিক্ষার্থী, দুজনই বেকার। নতুন সংসার, নতুন স্বপ্ন, আর নতুন করে বিসিএসের প্রস্তুতি—সবকিছুর শুরু হলো একসঙ্গে।
বিয়ের পর তোমাকে আরও বেশি করে পাশে পেলাম। একসময় মনে হয়েছিল, আগে বিয়ে করায় হয়তো পুলিশের এসআই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারিয়েছি। তখন তুমি শুধু বলেছিলে, “তুমি এর চেয়েও ভালো কিছু করবে।” আজ বুঝি, তোমার সেই বিশ্বাসই ছিল আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।
তারপর এলো ৪৬তম বিসিএস। আবারও প্রিলিতে ব্যর্থ হলাম। মনে হচ্ছিল, বিসিএস হয়তো আমার জন্য নয়। ফল প্রকাশের দিন তোমাদের বাসায় গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। তুমি সব দেখেছো, সব বুঝেছো। একটিবারও হতাশ হতে দাওনি। বরং নতুন করে শুরু করার সাহস জুগিয়েছো।
এরই মধ্যে জানতে পারলাম, আমরা মা-বাবা হতে চলেছি। আনন্দে ভরে উঠল জীবন। ঠিক এক সপ্তাহ পর ৪৬তম বিসিএসের সংশোধিত ফল প্রকাশ হলো, আর এবার আমি উত্তীর্ণ হলাম। আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। এরপর একের পর এক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি, খুব কম ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছি। মনে হয়, আমাদের ছেলে দাবির ফুয়াদ জন্মের আগেই আমার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল।
৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষাও ভালো দিয়েছিলাম। কিন্তু ফলাফলে আবারও ব্যর্থতা। কষ্ট পেয়েছি, তবে হাল ছাড়িনি। বরং আরও বেশি পরিশ্রম করার প্রেরণা পেয়েছি।
তারপর এলো ২ জুন ২০২৫। পৃথিবীতে এলো আমাদের ছেলে—দাবির ফুয়াদ। মনে হলো, সে যেন তার সঙ্গে করে আমার সৌভাগ্যও নিয়ে এসেছে। গর্ভধারণ থেকে সন্তান জন্ম, সব কষ্ট, সব দায়িত্ব একাই বহন করেছো তুমি।
এরপর ৪৭তম বিসিএসের প্রিলি ও লিখিত—দুটোই পাস করলাম। ১৭ জুন ছিল ভাইভা। আমার বাবা-মা প্রায়ই ফুয়াদকে বলতেন, “তোমার বাবার জন্য দোয়া করো, যেন ভালো চাকরি পায়।” আমার শাশুড়িও তাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন কীভাবে দুই হাত তুলে দোয়া করতে হয়। ভাইভার আগের রাতে ভিডিও কলে ছেলেকে বলেছিলাম, “বাবা, আমার জন্য দোয়া করো।” সে সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত তুলে দোয়া করেছিল। সেই দৃশ্য আজও চোখে ভাসে।
ভাইভা খুব একটা ভালো হয়নি। বেরিয়ে এসে তোমাকে বলেছিলাম, “মনে হয় এবারও হবে না। নন-ক্যাডার পেলেও আমি খুশি।”
কিন্তু আল্লাহ হয়তো আমার ছোট্ট ছেলের নিষ্পাপ দোয়া কবুল করেছিলেন। ফল প্রকাশের দিন আমি বাসে ছিলাম। বাড়ি থেকে ছেলের কাছে যাচ্ছিলাম। তালিকায় নিজের রোল নম্বর দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। কয়েকবার মিলিয়ে দেখলাম। সত্যিই আমি পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি।
সেদিন ফল দেখার পর প্রথমেই গ্যালারি খুলে ছেলের ছবিটা দেখেছিলাম। চোখের কোণে অজান্তেই পানি চলে এসেছিল। মনে মনে বলেছিলাম, “বাবা, তুমি আমার জীবনে সত্যিই সৌভাগ্য হয়ে এসেছো।”
আজ যখন পেছনে তাকাই, বুঝতে পারি—এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তোমার। ছেলে হওয়ার পর থেকে চাকরি, সংসার, সন্তানের লালন-পালন—সবকিছু একাই সামলেছো। আর আমাকে শুধু একটাই কথা বলেছো, “তুমি পড়ো, বাকিটা আমি দেখছি।”
মাস্টার্স শেষ হওয়ার পর তোমার চাকরি হলো। আমি তখনও বেকার, শুধু টিউশনি করতাম। বিসিএসের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব বই, খাতা, কলম—সব তুমি কিনে দিয়েছো। আমি টাকা দিতে চাইলে নিতে না। ৪৭তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার আগে প্রায় সব টিউশনি ছেড়ে দিয়েছিলাম, যাতে পড়াশোনায় বেশি সময় দিতে পারি। তখন নিজের কিছু সঞ্চয় আর তোমার দেওয়া টাকাতেই মাস কেটে যেত। সত্যি বলতে, আজও তোমার সেই সহযোগিতা চলমান।
অনেকেই মজা করে বলে, “বউয়ের অনুপ্রেরণায় ক্যাডার”, “বউয়ের ভাগ্যে ক্যাডার”। আগে এসব শুনে হাসতাম। কিন্তু আজ নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে বলতে দ্বিধা নেই—আমার সাফল্যের পেছনে যদি একজন মানুষের নাম বলতে হয়, তবে সে তুমি।
তুমি শুধু আমার স্ত্রী নও; তুমি আমার সাহস, আমার ভরসা, আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
শুভ জন্মদিন, সামিনা। আল্লাহ তোমাকে সুস্থ, সুখী ও দীর্ঘায়ু করুন। তোমার সব স্বপ্ন পূরণ হোক। আমি যেন সারাজীবন তোমার পাশে থাকতে পারি, তোমার সব ত্যাগের প্রতিদান ভালোবাসা আর সম্মানের মাধ্যমে দিতে পারি—এই দোয়াই করি।
শুভ জন্মদিন, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মানুষ। ❤️