বাবার স্বপ্ন থেকে বিসিএসে তিনবার সাফল্য: অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও সংগ্রামের অনন্য দৃষ্টান্ত ফাতেমা তুজ জোহরার
মিজানুর রহমান,বিশেষ প্রতিবেদন:
“মেয়েদের এত পড়াশোনা করিয়ে কী হবে, বড় হলে তো বিয়ে দিয়েই দিতে হবে”—সমাজের এমন অসংখ্য নেতিবাচক মন্তব্যকে উপেক্ষা করে তিন মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন এক বাবা। সেই স্বপ্নই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বাবার অদম্য বিশ্বাস, নিজের কঠোর পরিশ্রম এবং মহান আল্লাহর প্রতি আস্থাকে পাথেয় করে একের পর এক সাফল্য অর্জন করেছেন মোছাঃ ফাতেমা তুজ জোহরা।
তিনি ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এছাড়া ৪৬তম ও ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারেও সুপারিশ পেয়েছেন। নিজের এই অর্জনকে তিনি মহান আল্লাহর অশেষ রহমত এবং প্রয়াত বাবার স্বপ্নের বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছেন।
ফাতেমা তুজ জোহরার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলায় হলেও বাবার চাকরির সুবাদে ছোটবেলা থেকেই তাঁর বেড়ে ওঠা বগুড়া শহরে। খুব ছোট বয়স থেকেই বাবা মেয়েকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতেন। সমাজের নানা কটূক্তি সত্ত্বেও তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষাই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
ফাতেমা জানান, তাঁর বাবা প্রতিদিন খুব ভোরে অফিসে যাওয়ার আগে তাঁকে গণিত পড়াতেন এবং সারাদিনের পড়ার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে যেতেন। বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত বাবার কাছেই বেশি পড়াশোনা করেছেন তিনি। ভালো ফলাফল করলেই বাবা বিভিন্ন উপহার দিয়ে উৎসাহিত করতেন। একবার রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ায় বাবা তাঁকে একটি ক্যামেরা কিনে দিয়েছিলেন, যা আজও তাঁর জীবনের অন্যতম প্রিয় স্মৃতি।
এসএসসি পাসের পর তিনি উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী সরকারি আজিজুল হক কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকেই তাঁর জীবনের নতুন মোড় শুরু হয়। স্বপ্ন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলে বাবা ছিলেন ভীষণ আনন্দিত।
পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষ থেকেই বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন। প্রথমে নিজের কক্ষে, পরে হলের লাইব্রেরিতে নিয়মিত পড়াশোনা করতেন। প্রথম বিসিএসেই প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাবার মৃত্যু তাঁর জীবনে বড় ধাক্কা হয়ে আসে।
প্রিয় বাবাকে হারিয়ে যেন সব স্বপ্ন থমকে গিয়েছিল। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু বাবার স্বপ্ন এবং নিজের লক্ষ্যকে সামনে রেখে আবারও ঘুরে দাঁড়ান তিনি।
২০২৪ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে চাকরি পান। চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও রাত জেগে বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে যান। অফিস শেষে ঢাকা ও মাদারীপুরে বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নিতে নিয়মিত যাতায়াত করতে হতো। শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি থাকলেও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে এগিয়ে গেছেন নিজের স্বপ্নের পথে।
এরপর ২০২৫ সালে একটি ব্যাংকে চাকরি লাভ করেন। একই সঙ্গে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিও চালিয়ে যেতে থাকেন। অবশেষে একে একে ৪৬তম, ৪৭তম ও ৪৯তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে গড়েছেন অনন্য সাফল্যের ইতিহাস।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে মোছাঃ ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আমি আমার বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। ভবিষ্যতে দেশ ও জনগণের কল্যাণে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যেতে চাই, ইনশাআল্লাহ।”
ভবিষ্যৎ বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “স্বপ্ন পূরণ করতে হলে সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং সৎ উদ্দেশ্য থাকতে হবে। বিশেষ করে মেয়েদের জীবনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ আসে। সেই চ্যালেঞ্জগুলোকে ভয় না পেয়ে দৃঢ় মানসিকতায় মোকাবিলা করতে হবে। জীবনের প্রতিটি ধাপে বিনয়, সততা ও মানবিকতা ধরে রেখে কাজ করলেই সফলতা একদিন ধরা দেবে।”
মোছাঃ ফাতেমা তুজ জোহরার এই সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে—সংগ্রাম, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়। তাঁর এই অর্জন নতুন প্রজন্মের, বিশেষ করে নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।