সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় জন্মগ্রহণ করেও অদম্য মনোবল, আত্মবিশ্বাস ও নিরলস অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অর্জন করেছেন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার গৌরব।
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:
একসময় স্বপ্ন ছিল সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে জড়িয়ে চিকিৎসক হওয়ার। কিন্তু মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অল্পের জন্য সুযোগ না পাওয়ায় সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। তবে ব্যর্থতাকে কখনোই শেষ গন্তব্য মনে করেননি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মেধাবী তরুণ মেহেদী হাসান নাইম। দৃঢ় মনোবল, কঠোর পরিশ্রম, পরিকল্পিত প্রস্তুতি এবং নিজের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের মাধ্যমে তিনি অর্জন করেছেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে লাইভস্টক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি ৫০তম বিসিএসের ভাইভা পরীক্ষার্থী হিসেবেও রয়েছেন।
১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার উত্তর কানা পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মেহেদী হাসান নাইম। পদ্মা নদীর তীরঘেঁষা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা গ্রামেই কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। শিক্ষাজীবনের শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দাদার হাত ধরে। পরে খালু ও মামাদের উৎসাহ, অনুপ্রেরণা এবং দিকনির্দেশনা তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
চর নওশেরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন তিনি। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি লাভের পাশাপাশি সবসময় শ্রেণির প্রথম স্থান ধরে রাখেন। এরপর চর আষাড়িয়াদহ কানা পাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০১৬ সালে জিপিএ-৫ নিয়ে এইচএসসি পাস করেন। বিদ্যালয়ে তাঁর রোল নম্বর ছিল ২ এবং কলেজের প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন।
এইচএসসি শেষে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল মেডিকেলে ভর্তি হওয়া। কিন্তু ভাগ্য সেদিন সহায় হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও পছন্দের বিষয় না হওয়ায় তিনি সেখানে ভর্তি হননি। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিভাগে ভর্তি হন। মেডিকেলে আরেকবার সুযোগ পাওয়ার আশায় আরও এক বছর চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল না আসায় তিনি হতাশ হননি। বরং নতুন বাস্তবতাকে গ্রহণ করে নিজের পথ নিজেই তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন।
ভেটেরিনারি শিক্ষার দীর্ঘ পথচলা, করোনা মহামারির প্রভাব এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি একাডেমিক পড়াশোনা ও বিসিএস প্রস্তুতি সমানতালে চালিয়ে গেছেন। অনার্সে তাঁর সিজিপিএ ছিল ৩.৫৯ এবং মাস্টার্সে ৩.৯১। গবেষণার বিষয় ছিল— “Antibiotic Sensitivity Profiling of Non-Specific Microbial Isolates from Commercial Poultry Farms in Selected Areas of Natore and Rajshahi।”
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন লালন করতেন মেহেদী। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছেন। বাজারে প্রচলিত প্রায় সব ধরনের প্রস্তুতির বই সংগ্রহ করেছেন, নিয়মিত জাতীয় দৈনিক পড়েছেন এবং বিভিন্ন মেন্টর ও সিনিয়রদের পরামর্শ অনুসরণ করেছেন। তাঁর পড়ার টেবিল দেখে অনেকেই মজা করে বলতেন, এটি যেন একটি ছোটখাটো লাইব্রেরি।
শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ সময় তিনি টিউশনি করেছেন। একই সঙ্গে চাকরির প্রস্তুতিও চালিয়ে গেছেন সমান উদ্যমে। তাঁর ভাষায়, সবসময় সমানভাবে পড়াশোনা করা সম্ভব না হলেও তিনি কখনোই প্রস্তুতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেননি।
গ্রাজুয়েশন শেষ হওয়ার পর খুব বেশি সময় বেকার থাকতে হয়নি তাঁকে। বিসিএসকেই মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরে রাখায় বিসিএস ছাড়া মাত্র চারটি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেন। নিজের ওপর ছিল অটুট বিশ্বাস— “আজ না হলে কাল, বিসিএসে সফল হবই।” সেই আত্মবিশ্বাস এবং নিরলস প্রচেষ্টার ফল হিসেবেই তিনি ৪৭তম বিসিএসে লাইভস্টক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মেহেদী হাসান নাইম বলেন, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মুখে আনন্দের হাসি দেখেই তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সার্থক মনে হয়েছে। তিনি এই অর্জনের জন্য মহান আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, বড় ভাই-বোন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। বিশেষভাবে তিনি তাঁর পরিবার, মামা, বান্ধবী মুনিয়া এবং তারেক ভাইয়ের অবদানের কথা উল্লেখ করেন।
নতুন বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, স্বপ্ন পূরণ করতে হলে অধ্যবসায়ের কোনো বিকল্প নেই। বিসিএসের সিলেবাস ভালোভাবে বুঝে পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। নিয়মিত মডেল টেস্ট দেওয়া, প্রশ্ন বিশ্লেষণ করা, নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠা এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তরপত্রের উপস্থাপনার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, অনেকেই দ্রুত সফল হন, আবার কারও সফল হতে সময় লাগে। তাই ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে ধৈর্য, পরিশ্রম এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যেতে হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মেহেদী হাসান নাইম বলেন, একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দেশের প্রাণীসম্পদ খাতের উন্নয়ন, নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চান।
মেহেদী হাসান নাইমের এই সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে, জীবনের কোনো ব্যর্থতাই চূড়ান্ত নয়। লক্ষ্য যদি স্পষ্ট থাকে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে, তবে একদিন সাফল্য ধরা দিতেই বাধ্য। তাঁর এই অর্জন হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।