জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের পর সহিংসতায় প্রাণহানি: ধর্ষণ, নির্যাতন ও মব সহিংসতা গভীর উদ্বেগজনক
আওরঙ্গজেব কামাল : জুলাই–আগস্ট আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এবং পরবর্তী সময়জুড়ে দেশে যে সহিংসতার চিত্র সামনে এসেছে, তা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একজন সাংবাদিক হিসেবে নিরপেক্ষ তথ্য তুলে ধরাই দায়িত্ব—সে বিবেচনায় দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা, গণমাধ্যম প্রতিবেদন এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা আনুমানিক ১,২০০ থেকে ১,৫০০-এরও বেশি। জুলাই–আগস্ট আন্দোলন সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় এক হাজারের বেশি প্রাণহানির অভিযোগ রয়েছে এবং আন্দোলনের পরও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আধিপত্য বিস্তার ও দখলদারিত্বকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে; ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১৫৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। দেশজুড়ে মব লিঞ্চিং একটি নতুন সামাজিক আতঙ্কে পরিণত হয়েছে এবং ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৫৬ জন, কিছু পর্যবেক্ষণে এই সংখ্যা ১৬৫ ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে; বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাসেই ১২০ জনের বেশি প্রাণহানির তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতা নির্দেশ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মব সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। একই সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক; ২০২৪ সালে ৫০০-এর বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে এবং একই বছরে ১৪০টির বেশি গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে; সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ধর্ষণের পর হত্যা, যেখানে অন্তত ২৫ থেকে ৪০ জন নারী নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে শুধুমাত্র ধর্ষণ মামলাই দায়ের হয়েছে ১,০০০-এর বেশি, তবে সামাজিক লজ্জা, ভয় ও চাপের কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে; ২০২৪ সালে মোট নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ২,৫০০ ছাড়িয়েছে এবং এতে নিহত হয়েছেন প্রায় ৫০০-এর বেশি নারী ও শিশু; পাশাপাশি বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকজনিত নির্যাতন ও শিশু নির্যাতনের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সুযোগে দেশজুড়ে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; অন্তত ২,০০০-এর বেশি হামলার তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ অন্তর্ভুক্ত, এবং ১৫০টিরও বেশি বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এখনো পুনর্বাসনের অপেক্ষায় রয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতাও বড় উদ্বেগের বিষয়; ২০২৪ সালের আগস্টে দুই হাজারের বেশি হামলার অভিযোগ ওঠে এবং ২০২৪ থেকে ২০২৫ সময়কালে প্রায় ২,৪০০টির বেশি হেট ক্রাইমের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন; মন্দির, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও জোরপূর্বক দখলের অভিযোগও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশিত তথ্যই চূড়ান্ত নয়—বাস্তব চিত্র আরও গুরুতর হতে পারে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেক ঘটনা এখনো রিপোর্টের বাইরে থেকে যাচ্ছে; আইনি জটিলতা, প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং সামাজিক ভয়ের কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে এবং বিশেষজ্ঞরা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, নারী ও শিশু সুরক্ষা জোরদার এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের পর যে সহিংসতার ধারা তৈরি হয়েছে, তা এখন একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে; রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সমাজের সকল স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির আভাস পাওয়া গেলেও ছিনতাই, মব গঠন ও বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা এখনো উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান; বিশিষ্টজনেরা মনে করেন, অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, কারণ দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো অকারণে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জরুরি, নিরপেক্ষ ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
লেখক ও গবেষক: আওরঙ্গজেব কামাল, সভাপতি, ঢাকা প্রেসক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব।