২২ জুন ২০২৬ লন্ডন যুক্তরাজ্য থেকে সোহেল সরকারঃ
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের পটপরিবর্তন। তীব্র দলীয় চাপ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মুখে পড়ে অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। আজ সোমবার (২২ জুন ২০২৬) লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে এক আবেগঘন ও আকস্মিক ভাষণে তিনি লেবার পার্টির প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানান।
বিবিসি বাংলাসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সূত্র অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং দলের ভেতরে ক্রমাগত বাড়তে থাকা অনাস্থার কারণেই তিনি এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। স্যার কিয়ের স্টারমারের এই বিদায়ের ফলে যুক্তরাজ্য গত এক দশকের মধ্যে তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে, যা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
পদত্যাগের নেপথ্যে: মে মাসের বিপর্যয় ও জনপ্রিয়তা ধস
ডাউনিং স্ট্রিটের ভাষণে স্টারমার স্বীকার করেন যে, আগামী সাধারণ নির্বাচনে দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি উপযুক্ত ব্যক্তি কি না, তা নিয়ে লেবার পার্টির ভেতরেই জোরালো প্রশ্ন উঠেছিল। দলীয় সংসদ সদস্যদের সেই মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও “উত্তর শুনেছেন” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি উদার মনে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে পদত্যাগ করছি।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত মে মাসে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় ধরনের আসন ও সমর্থন হারানোর পর থেকেই স্টারমারের বিদায়ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছিল। ওই নির্বাচনের পর থেকেই দলের ভেতরে তাঁর নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়ে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়।
অনুঘটক হিসেবে ‘অ্যান্ডি বার্নহাম’ প্রভাব
স্টারমারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ক্ষেত্রে মূল অনুঘটক বা ‘ক্যাটালিস্ট’ হিসেবে কাজ করেছে লেবার পার্টির প্রভাবশালী নেতা এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের রাজনৈতিক উত্থান। গত সপ্তাহে মেকারফিল্ড (Makerfield) উপনির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে পার্লামেন্টে ফিরে আসেন বার্নহাম। তাঁর এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন লেবার পার্টির একটি বড় অংশকে আশাবাদী করে তোলে এবং দলের সংসদ সদস্যরা মনে করতে শুরু করেন যে, স্টারমারের চেয়ে বার্নহামই এখন দলকে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারবেন।
অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব ও পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময়সূচি
আকস্মিক পদত্যাগ করলেও দেশের শাসনব্যবস্থায় যেন কোনো শূন্যতা তৈরি না হয়, সেদিকে নজর রাখছেন স্টারমার। নতুন দলীয় প্রধান নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটিকে (NEC) দ্রুত নতুন নেতা নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্ধারিত রূপরেখা অনুযায়ী:
৯ জুলাই ২০২৬: দলীয় প্রধান পদের জন্য মনোনয়ন উন্মুক্ত করা হবে।
সেপ্টেম্বর ২০২৬: নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষে নতুন প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটেনের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
লড়াইয়ে অ্যান্ডি বার্নহাম, মিলছে শীর্ষ নেতাদের সমর্থন
এদিকে স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার পরপরই আর কোনো সময় নষ্ট না করে অ্যান্ডি বার্নহাম আনুষ্ঠানিকভাবে লেবার পার্টির পরবর্তী প্রধান এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দিয়েছেন। ডাউনিং স্ট্রিটের দৌড়ে বার্নহাম ইতিমধ্যেই বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংসহ লেবার পার্টির শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাই প্রকাশ্যে বার্নহামের প্রতি তাঁদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
সব মিলিয়ে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনের রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন কিছুতেই কাটছে না। স্টারমারের এই আকস্মিক বিদায় এবং নতুন নেতৃত্বের আগমন আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।