মাদারীপুরের শিবচরের কৃতি সন্তান ইমরান ৪৭তম বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:অদম্য সংগ্রাম—এই তিনকে সঙ্গী করেই স্বপ্নের শিখরে পৌঁছেছেন মাদারীপুরের শিবচরের কৃতী সন্তান ইমরান। পদ্মার তীরবর্তী একটি বন্যা কবলিত সুবিধা বঞ্চিত স্কুলে পড়াশোনা শুরু করে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তিনি ৪৭তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
তাঁর এই সাফল্যের গল্প আজ হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইমরানের শিক্ষাজীবনের সূচনা শিবচরের পদ্মাভাঙা এলাকার কুতুবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। ২০১২ সালে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার সময় বিদ্যালয়ে পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান পড়ানোর কোনো শিক্ষক ছিলেন না। এমনকি উচ্চতর গণিত পড়ারও সুযোগ ছিল না। প্রতিকূলতার মধ্যেও কৃষিকে চতুর্থ বিষয় হিসেবে নিয়ে নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
ইচ্ছা ছিল ঢাকায় উচ্চমাধ্যমিক পড়ার। কিন্তু কৃষক বাবার সীমিত আয় ও পাঁচ ভাইবোনের সংসারের দায়িত্বের কথা ভেবে সেই স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়। পরে সরকারি বরহামগঞ্জ কলেজ,শিবচর থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন।
কৃষক বাবার হাত ধরেই ছোটবেলা থেকে কৃষির সঙ্গে পরিচয়। সেই ভালোবাসাই তাঁকে কৃষি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে। কৃষি নিয়েই অনার্স সম্পন্ন করে অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে বাবার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি।
ইমরান বলেন, তাঁর বাবা কখনো কঠোর শাসন করেননি। বরং সবসময় একটি কথাই বলতেন—”আমি পড়াশোনা করতে পারিনি, তাই জীবনে অনেক কিছু করতে পারিনি। তোরা পড়াশোনা কর।” বাবার এই উপদেশই ছিল তাঁর এগিয়ে চলার সবচেয়ে বড় শক্তি।
সংসারের অভাব ঘোচাতে বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করেছেন, অন্যের জমিতেও শ্রম দিয়েছেন। নিজের ছোট ছোট স্বপ্ন পূরণেও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। একটি হাতঘড়ি কেনার ইচ্ছাও আর্থিক সংকটের কারণে অপূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু কোনো বাধাই তাঁর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি।
২০২৬ সালের ২৮ জুন ৪৭তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার খবর পাওয়ার পর জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি আসে। বহুদিনের লালিত ইচ্ছা পূরণ করে বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে তাঁদের পায়ে সালাম করেন। সেই অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “সেদিন মনে হয়েছিল, জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়া পূরণ হয়ে গেছে।”
শৈশবের একটি স্মৃতিও আজ তাঁর সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ছোটবেলায় তাঁর এক বোন স্বপ্নের ঘোরে বলেছিলেন, “ইমরান কি পড়তে পারবে?” সময়ের ব্যবধানে সেই প্রশ্নের উত্তর আজ নিজের সাফল্য দিয়েই দিয়েছেন তিনি।
ইমরানের এই অর্জন আবারও প্রমাণ করে—সুযোগ-সুবিধার অভাব নয়, দৃঢ় সংকল্প, কঠোর পরিশ্রম এবং পরিবারের অনুপ্রেরণাই মানুষকে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। তাঁর জীবনগাথা আজ দেশের অসংখ্য সংগ্রামী শিক্ষার্থীর জন্য সাহস, আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্নপূরণের এক অনন্য অনুপ্রেরণা।