চারবারের চেষ্টায় স্বপ্নের বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে জাবেদ হোসেন
ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে এএসপি পদে সুপারিশ, সাফল্যের আনন্দে বাবার শূন্যতা
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:বারবার ব্যর্থতা এলেও হাল ছাড়েননি। অদম্য অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের ফল হিসেবে অবশেষে স্বপ্নপূরণ হলো মো. জাবেদ হোসেনের। সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে তিনি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। চারবারের প্রচেষ্টার পর কাঙ্ক্ষিত ক্যাডারে সুপারিশ পেয়ে তিনি এখন বিসিএস প্রত্যাশীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর চরনদ্বীপ গ্রামের বাসিন্দা মো. জাবেদ হোসেন স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ৩.৮৭ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি বোয়ালখালীর হাওলা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।
বিসিএসে তাঁর পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। ৪৪তম বিসিএসে তিনি প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এরপর ৪৫তম বিসিএসে নন-ক্যাডার (ইনস্ট্রাক্টর) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও এখনো সেই পদে যোগদান শুরু হয়নি। ৪৬তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভাইভা দিলেও চূড়ান্ত ফলাফলে ক্যাডার পাননি। তবে ব্যর্থতায় থেমে না গিয়ে নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি চালিয়ে যান। অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে সুপারিশ পেয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়। এ বিসিএসে তাঁর ক্যাডার পছন্দক্রম ছিল প্রশাসন, পুলিশ, কাস্টমস, ট্যাক্স ও অডিট।
বর্তমানে তিনি সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
নিজের প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জাবেদ হোসেন বলেন, বিসিএসের প্রস্তুতির শুরুতেই তিনি বিগত বছরের প্রশ্ন ও সিলেবাস বিশ্লেষণ করে প্রতিটি বিষয়ে নিজের শক্তি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করেন। এরপর বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনা করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। বাংলা সাহিত্য, গণিত ও ইংরেজির জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করে ধারাবাহিকভাবে প্রস্তুতি নেন। লিখিত পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আগে শেষ করা, প্রয়োজনীয় তথ্য বইয়ে চিহ্নিত রাখা এবং নিজস্ব নোট তৈরি করাই ছিল তাঁর প্রস্তুতির অন্যতম কৌশল। তিনি জানান, ২০২১ সালের শেষ দিকে প্রস্তুতি শুরু করলেও ২০২২ সালের শুরু থেকে পুরোপুরি বিসিএস প্রস্তুতিতে মনোনিবেশ করেন।
নতুন বিসিএস প্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে নিয়মিত প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে বিসিএসের পাশাপাশি বিকল্প ক্যারিয়ার পরিকল্পনাও রাখা উচিত, যাতে প্রয়োজন হলে অন্য সুযোগ গ্রহণ করা যায়। তিনি একই বিষয়ের জন্য একাধিক বই না কিনে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই অনুসরণ এবং নিয়মিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকা পড়ার পরামর্শ দেন।
তবে এই সাফল্যের আনন্দের মধ্যেও রয়েছে গভীর বেদনা। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর বাবা মৃত্যুবরণ করেন। বাবার স্মৃতিচারণ করে আবেগঘন কণ্ঠে জাবেদ হোসেন বলেন, তাঁর মা-বাবা জীবনের অধিকাংশ সময় সংগ্রাম করেছেন শুধুমাত্র ছেলেকে মানুষ করার জন্য।
তিনি বলেন, “বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সীমিত সামর্থ্য নিয়েও তিনি আমাকে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন। সব সময় বলতেন, যত দিন বেঁচে আছি, ছেলেকে পড়াব। গ্র্যাজুয়েশনের পরও কখনো চাকরির জন্য চাপ দেননি। বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্তে তিনি ও মা আমাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। সংসারের আর্থিক কষ্ট কিংবা ধারদেনার কথা কখনো বুঝতে দেননি। নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়েও আমার পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন।”
জাবেদ হোসেনের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি প্রমাণ করে যে ধৈর্য, অধ্যবসায়, সঠিক পরিকল্পনা এবং পরিবারের অকৃত্রিম সমর্থন থাকলে বারবার ব্যর্থতার পরও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।