স্বপ্ন থেকে সাফল্যে: ভালোবাসা, ত্যাগ আর অধ্যবসায়ে ৪৭তম বিসিএসে একই ক্যাডারে স্বামী-স্ত্রীর অনন্য অর্জন
মিজানুর রহমান,বিশেষ প্রতিবেদন:
ভালোবাসা, পারস্পরিক সহযোগিতা, কঠোর পরিশ্রম এবং সুদৃঢ় লক্ষ্য—এই চারটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এক অনন্য সাফল্যের গল্প গড়েছেন স্বামী-স্ত্রী সাহাজ উদ্দিন ও জেরিন আক্তার। ৪৭তম বিসিএসে দুজনই একই ক্যাডারে সহকারী পরিচালক/কৃষি বিপণন কর্মকর্তা পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
সাহাজ উদ্দিন নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের আব্দুর রউফের ছেলে। অন্যদিকে জেরিন আক্তারের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায়। তাঁর বাবা আব্দুল কাফি।
সাফল্যের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে সাহাজ উদ্দিন জানান, বিয়ের পর শুরু থেকেই তাঁরা দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেই থাকতেন। তাই সংসারের বড় ধরনের চাপ শুরুতে অনুভব করতে হয়নি। পরিবার থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও নিজেদের উপার্জনে চলতে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।আমি টিউশনি করে নিজের খরচ নিজে চালাতাম।
তিনি বলেন, “আমরা শুধু একসঙ্গে লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করিনি, বাজার করতেও একসঙ্গে যেতাম। সংসারের কাজও ভাগাভাগি করে করতাম। কখনো আমি, কখনো জেরিন রান্নার দায়িত্ব নিয়েছি। এভাবেই একে অপরকে সহযোগিতা করে এগিয়ে গেছি।”
তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বিসিএসসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। যেহেতু তাঁরা ময়মনসিংহে অবস্থান করতেন, আর অধিকাংশ নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো ঢাকায়, তাই প্রতিটি পরীক্ষায় অংশ নিতে দীর্ঘ যাত্রা, সময় ও অর্থের চাপ সামলাতে হতো।
সাহাজ উদ্দিন জানান, কঠিন সময়গুলোতে তাঁদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দুই পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন। বিশেষ করে তাঁর বোন ও দুলাভাই এবং স্ত্রী জেরিনের বড় ভাই সবসময় ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। তাঁদের নিঃস্বার্থ সহযোগিতা, মানসিক সাহস ও উৎসাহই এই দীর্ঘ পথচলাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।
জীবনের দর্শন তুলে ধরে সাহাজ উদ্দিন বলেন, “প্রত্যেক মানুষের জীবন ও পরিকল্পনা আলাদা। তবে আমি বিশ্বাস করি, কেউ যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করে, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তার উত্তম প্রতিদান দেন। আমরা বিয়ে করেছিলাম হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে থাকার নিয়তে। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাদের সেই নিয়ত কবুল করেছেন এবং আমাদের পরিকল্পনাকে সফল করেছেন।”
ভবিষ্যৎ বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “নিয়মিত পড়াশোনা, সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে নিরলস পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। অনেকেই মনে করেন বিয়ে করলে ক্যারিয়ারে বাধা আসে। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, বিয়ে কোনো বাধা নয়। বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতা থাকলে এটি মানুষকে আরও দায়িত্বশীল, মনোযোগী ও কর্মক্ষম করে তোলে।”
৪৭তম বিসিএসে স্বামী-স্ত্রীর একই ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার এই অনন্য অর্জন শুধু তাঁদের পরিবারের জন্যই নয়, অসংখ্য তরুণ-তরুণীর জন্যও অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভালোবাসা, বিশ্বাস, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অবিচল অধ্যবসায় থাকলে জীবনের বড় স্বপ্নও যে বাস্তবে রূপ নেওয়া সম্ভব—সাহাজ উদ্দিন ও জেরিন আক্তারের সাফল্য তারই জীবন্ত প্রমাণ।