নিজস্ব প্রতিনিধি, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ):
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় ১২৪ শতাংশ জমি জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলায় মিজানুর রহমান (৫০) নামের এক এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেফতার করেছে তাড়াশ থানা পুলিশ। গত সোমবার সকালে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে এবং আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায়।
গ্রেফতারকৃত মিজানুর রহমান উপজেলার সগুনা ইউনিয়নের হেমনগড় গ্রামের মৃত মেহের উদ্দিনের ছেলে। এ মামলার অপর আসামি মো. ইমরান হোসেন আপেল (৪১) বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
মামলার বিবরণ ও ভুক্তভোগীর অভিযোগ:
মামলার বিবরণ ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, তাড়াশ থানাধীন কাটাবাড়ী মৌজার আরএস ১১৪৩ নম্বর খতিয়ানের আরএস ১২৭৯ দাগে ৮৯ শতাংশ, ১৪০২ দাগে ১৫ শতাংশ এবং ৫২৫১ দাগে ২০ শতাংশ—সব মিলিয়ে মোট ১২৪ শতাংশ সম্পত্তির মূল মালিক ছিলেন বিবাদীদের পিতা মৃত মেহের উদ্দিন। এছাড়া একই মৌজার আরএস ১২৮৭ নম্বর খতিয়ানের ১৪০২ দাগের ১৫ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন বিবাদীদের মাতা সুফিয়া খাতুন গং।
মেহের উদ্দিন ও সুফিয়া খাতুন জীবিত থাকাকালীন এবং তাদের উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তি ভোগদখলরত অবস্থায় বিবাদীরা উক্ত সম্পত্তি বিক্রির ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় ভুক্তভোগীর লন্ডন প্রবাসী চাচা উপযুক্ত মূল্যের বিনিময়ে ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি তাড়াশ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ৮৩ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে জমিগুলো ক্রয় করেন। এরপর থেকেই তিনি বৈধভাবে নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন করে নিয়মিত খাজনা পরিশোধ এবং বাদীর মাধ্যমে জমিতে ফসল উৎপাদন করে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছেন।
জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য:
ভুক্তভোগী সগুনা ইউনিয়নের ধামাইচ গ্রামের জহুরুল ইসলাম জুয়েলের ছেলে শাহরিয়ার জয় জুয়েল অভিযোগ করেন, নালিশি সম্পত্তিটি বিবাদীদের বাড়ির নিকটবর্তী হওয়ায় মিজানুর রহমানসহ অন্য বিবাদীরা অসৎ উদ্দেশ্যে জমি দখলের পাঁয়তারা শুরু করেন। এরই অংশ হিসেবে তারা ৫৫৭ নম্বর দলিলের বিষয়ে প্রথমে ১৯৮৬ সালের ১৭ জানুয়ারি আদালতের একটি ভুয়া দলিল প্রদর্শন করেন। কিন্তু সেদিন শুক্রবার হওয়ায় পরে কৌশল পরিবর্তন করে একই দলিলের ১৭ তারিখকে ২৭ বানিয়ে পিবিআইয়ের কাছে ভুয়া ও কথিত ফটোকপি দলিলটি জমা দেন। উল্লেখ্য, ওই ভুয়া দলিলের টিপ সই ও সিরিয়াল নম্বরেও গরমিল রয়েছে বলে পিবিআই রিপোর্টে প্রমাণিত হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ওই কথিত ফটোকপি দলিলে নাটোরের সিংড়া উপজেলার ঠ্যাঙ্গা পাকুরিয়া মৌজার ৮৫০ নম্বর দাগের কথা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে ওই মৌজায় এমন কোনো দাগের অস্তিত্বই নেই। এ ছাড়া দলিলের রেজিস্ট্রি তারিখের পরে স্ট্যাম্প ক্রয় করা হয়েছে, যা দলিলটি জাল মর্মে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।
সম্পূর্ণ ভুয়া ও বানোয়াট এই দলিলের ভিত্তিতে বিবাদীরা সিরাজগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪/১৪৫ ধারায় একটি মামলা (এমআর-৮২) দায়ের করেন। ওই জাল দলিলের ফটোকপি দেখিয়ে জমি নিজেদের দাবি করে ভুক্তভোগী পরিবারকে নানাভাবে হয়রানি এবং জোরপূর্বক নালিশি সম্পত্তি বেদখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন তারা।
পুলিশের বক্তব্য:
পরবর্তীতে এই হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড ও দলিল জালিয়াতির ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের হলে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তাড়াশ থানা পুলিশের একটি দল গত সোমবার সকালে অভিযান চালিয়ে ১ নম্বর আসামি মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করে।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও এএসআই উত্তম কুমার জানান, “অভিযান চালিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি মিজানুর রহমানকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। বাকি আসামিকে গ্রেফতারেও আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”