বাবাকে হারিয়েও থেমে যাননি: মায়ের ত্যাগে বিসিএস কৃষি ক্যাডার হলেন যোবায়ের রহমান
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:
“সংগ্রাম কখনো স্বপ্নকে থামাতে পারে না, যদি থাকে মায়ের দোয়া আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি।”—এই কথারই বাস্তব উদাহরণ জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার তরুণ মো. যোবায়ের রহমান। জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে জয় করে তিনি ৪৭তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
আলহামদুলিল্লাহ—জীবনের অন্যতম বড় অর্জনের অনুভূতি প্রকাশ করে যোবায়ের রহমান বলেন, এই সাফল্যের সর্বপ্রথম কৃতিত্ব মহান আল্লাহর, এরপর তাঁর মায়ের। তিনি বিশ্বাস করেন, আল্লাহর অশেষ রহমত, মায়ের নিরন্তর দোয়া, ত্যাগ ও নিজের অধ্যবসায়ের ফলেই আজ তিনি বিসিএস ক্যাডার হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
যোবায়ের রহমানের জন্ম জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার ৭ নং চরবানী পাকুড়িয়া ইউনিয়নের রান্ধুনিগাছা গ্রামে। ছোটবেলাতেই নেমে আসে জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত। তিনি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়তেন, তখন তাঁর বাবা মৃত্যুবরণ করেন। এরপর থেকেই সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর মায়ের কাঁধে।
স্বামীকে হারানোর পরও ভেঙে না পড়ে সন্তানকে মানুষ করার সংকল্পে অবিচল ছিলেন তাঁর মা। নিজের সব স্বপ্ন, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম আর অসীম ত্যাগের মাধ্যমে তিনি ছেলেকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছেন। যোবায়েরের ভাষায়, তাঁর মা একজন সত্যিকারের “Iron Lady”, যার ত্যাগের কাছে তাঁর এই অর্জনও অনেক ছোট।
তিনি বলেন, “যে বৃক্ষ ফল দেয়, তার শিকড় মাটির গভীরেই লুকিয়ে থাকে; সন্তানের সাফল্যের আড়ালেও লুকিয়ে থাকে একজন মায়ের অসীম ত্যাগ।”
শিক্ষাজীবনেও ছিল তাঁর ধারাবাহিক সাফল্য। তিনি মহিরামকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর শিহাটা গমিজ উদ্দিন হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এবং সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়েট ও কুয়েটে ভর্তির সুযোগ পেলেও দেশের কৃষি খাতে অবদান রাখার প্রত্যয় এবং নিজের কৃষিনির্ভর শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিতে স্নাতক এবং উদ্যানতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি ১৮তম এনটিআরসিএ পরীক্ষায় কৃষি বিষয়ে সারা দেশে মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এছাড়া ২০২৩ সালভিত্তিক ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষায় অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদেও সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
সবশেষে, তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে ৪৭তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার মাধ্যমে।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে যোবায়ের রহমান বলেন, “হে আল্লাহ, আপনি যেমন আমাকে এই সম্মান দান করেছেন, তেমনি আমাকে যেন একজন সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত কর্মকর্তা হিসেবে কবুল করেন। আর আমার মাকে সুস্থতা, দীর্ঘ হায়াত, শান্তি ও উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন।”
সংগ্রাম, মায়ের সীমাহীন ত্যাগ, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস—এই চারটি শক্তিকে পাথেয় করে যোবায়ের রহমানের এই সাফল্যের গল্প নিঃসন্দেহে হাজারো তরুণ-তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।